ফজরের নামাজ—এটি শুধু দিনের সূচনা নয়, বরং আত্মিক জাগরণ ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের শ্রেষ্ঠ সময়। এই সময়টুকু যেমন নামাজের গুরুত্ব বহন করে, তেমনি এর পরবর্তী সময়েও রয়েছে কিছু অতুলনীয় জিকির ও আমল—যা রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই অনুশীলন করতেন এবং সাহাবিদের উৎসাহিত করতেন। ফজরের বিশেষ গুরুত্ব যেমন নামাজের মধ্যে আছে, তেমনি সময়ের মধ্যেও। কোরআনে সুরা ফজরের শুরুতে আল্লাহতাআলা বলেন: “শপথ ফজরের।” (সুরা ফজর: আয়াত ১)
ফজরের পরের ৪ কালেমার জিকির: সওয়াবে ভারী
সকালবেলা ফজরের নামাজের পর অর্থবহ ৪টি কালেমার জিকির প্রতিদান প্রাপ্তিতে অতুলনীয়। সকালের পুরো সময় ধরে ইবাদতের চেয়ে ওজনে ভারী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভাষায় ৪ কালেমা সমৃদ্ধ এই জিকির সকালবেলার সর্বোত্তম জিকির।
হাদিসে বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
হাদিসের বর্ণনায় সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে একটি ঘটনা। ফজরের নামাজের পর লম্বা সময় নামাজের স্থানে বসেছিলেন উম্মুল মুমিনিন হজরত জুওয়ায়রিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা। প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সঙ্গে কথা বললেন এবং সকালবেলার সর্বোত্তম জিকির সম্পর্কে তাকে জানালেন।
হজরত জুওয়ায়রিয়ার বর্ণনা
উম্মুল মুমিনিন হজরত জুওয়ায়রিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেছেন:
“রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যূষে (ফজরের নামাজ শেষ করে) তাঁর কাছ থেকে বের হলেন। যখন তিনি ফজরের নামাজ আদায় করলেন তখন আমি নামাজের জায়গায় ছিলাম। এরপর তিনি দোহার পরে (সূর্য ওঠার বেশকিছু সময় পর) ফিরে এলেন। তখনও আমি বসে ছিলাম। প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: ‘আমি তোমাকে যে অবস্থায় রেখে গিয়েছিলাম, তুমি সেই অবস্থায়ই আছো?’ আমি বললাম: হ্যাঁ। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: ‘আমি তোমার কাছ থেকে যাওয়ার পর ৪টি কালেমা ৩বার পড়েছি। আজকে তুমি এ পর্যন্ত যা বলেছ, তার সঙ্গে ওজন করলে এই কালেমা চারটির ওজনই বেশি হবে।'”
গুরুত্বপূর্ণ জিকির ও আমল
ফজরের নামাজের পর কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিকির ও আমল রয়েছে যা বান্দার জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, এবং লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির এই কালিমাগুলো পাঠ করা। এছাড়াও আয়াতুল কুরসি, সুরা ইয়া-সীন এবং অন্যান্য দোয়া ও তাসবিহ পাঠ করাও ফজিলতপূর্ণ আমল। নামাজ মুসলমানদের অন্যতম বিশেষ ইবাদত। প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে ফজরের নামাজের রয়েছে এক বিশেষ মর্যাদা ও তাৎপর্য।
ফজরের পরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আমল
১. আয়াতুল কুরসি
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, তার জান্নাতে প্রবেশের পথে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো অন্তরায় থাকবে না।”
উচ্চারণ: আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কায়্যুম লা তাখুযুহু সিনাতুও ওয়ালা নাউম। লাহু মা ফিস সামাওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ মান জাল্লাজি ইয়াশফাউ ইনদাহু ইল্লা বি ইজিনহি। এলামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়ামা খলফাহুম ওয়ালা ইউহিতুনা বিশাইয়িম মিন ইলিমহি ইল্লা বিমা শাআ। ওয়াসিআ কুরসিয়্যুহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ ওয়ালা এয়ুদুহু হিফজুহুমা ওয়াহুওয়াল আলিয়্যুল আজিম। (সুরা বাকারা : আয়াত ২৫৫)
এ আয়াতটি পড়তে খুব বেশি হলে এক মিনিট সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে পাঁচ মিনিট।
২. আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের দোয়া
হাদিসে বর্ণিত: “যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা তিনবার নিম্নের দোয়া পাঠ করবে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সন্তুষ্ট করবেন।”
দোয়া: রাজিতু বিল্লাহি রব্বাও ওয়াবিল ইসলামি দ্বীনাও ওয়াবি মুহাম্মাদিন নাবিয়্যা।
৩. সাইয়্যিদুল ইসতেগফার
নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যদি কেউ দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে সকাল-সন্ধ্যা নিম্নের ইসতেগফারটি পড়ে এবং ওই দিনে বা রাতে ইন্তেকাল করে তবে সে জান্নাতি হবে।”
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আন্তা রাব্বি লা ইলাহা ইল্লা আন্তা খালাকতানি ওয়া আনা আব্দুকা ওয়া আনা আলা আহিদকা ওয়া ওয়াদিকা মাস্তাতাতু আউজু বিকা মিন শাররি মা সানাতু আবুউ লাকা বিনিমাতিকা আলাইয়্যা ওয়া আবুউ বিজাম্বি ফাগফিরলী ফাইন্নাহু লা ইয়াগিফরুজ জুনুবা ইল্লা আন্তা।
অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি আমার প্রতিপালক। আপনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। আর আমি আপনার গোলাম। আমি আপনার ওয়াদা-প্রতিশ্রুতির ওপর যথাসাধ্য আছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। আমি আমার ওপর আপনার অনুগ্রহ স্বীকার করছি। আবার আমার গুনাহের কথাও স্বীকার করছি। অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। কেননা আপনি ছাড়া আর কেউ গুনাহগুলো ক্ষমা করতে পারবে না।
৪. জাহান্নাম থেকে মুক্তির দোয়া
হাদিসে এসেছে: “যে ব্যক্তি ফজর ও মাগরিবের পর সাতবার নিম্নের দোয়াটি পাঠ করে এবং ওই দিনে বা রাতে তার মৃত্যু হয়, তাহলে সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করবে।”
দোয়া: আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান্নার।
সুরা ইয়াসিন ও ইখলাসের ফজিলত
- সুরা ইয়াসিন পড়লে দশবার পুরো কোরআন পড়ার সমান সওয়াব
- তিনবার সুরা ইখলাস পড়লে একবার পুরো কোরআন তেলাওয়াতের সমান নেকি
ফজরের পর ইবাদতের বিশেষ পুরস্কার
আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করে, তারপর সূর্য ওঠা পর্যন্ত বসে বসে আল্লাহতাআলার জিকির করে, তারপর দুই রাকাত নামাজ আদায় করে, তার জন্য একটি হজ ও একটি ওমরার সাওয়াব রয়েছে।”
পরিশিষ্ট
মুমিন মুসলমানের উচিত ফজর নামাজের পর হাদিসে বর্ণিত ৪ কালেমার জিকির দ্বারা মহান আল্লাহর প্রশংসা করা। আল্লাহতাআলা আমাদের সবাইকে নবীজির শেখানো জিকির ফজরের নামাজের পর নিয়মিত পড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট