ছাত্রদলের ‘বিষফোঁড়া’ সৌরভপ্রিয় পালকে বহিষ্কার, চার নেতাকে ৪৮ ঘন্টা সময়

হামলা-মামলা-নারী নিপীড়নের অভিযোগ

সুনির্দিষ্ট একাধিক অভিযোগে চট্টগ্রামের বিতর্কিত ছাত্রদল নেতা সৌরভপ্রিয় পালকে বহিষ্কার করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ। চট্টগ্রামে জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের অফিস দখলের চেষ্টা ও নারীদের ওপর হামলা, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং মিথ্যা মামলার অভিযোগসহ একাধিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে কেন্দ্রীয় কমিটি এই পদক্ষেপ নেয় বলে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) রাতে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সৌরভকে সংগঠনের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং তার সঙ্গে সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাংগঠনিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের চার সাবেক ছাত্রদল নেতাকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। নয়তো গৃহীত হতে পারে স্থায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। এর আগে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের অনুসারী সৌরভপ্রিয় পালের পরিকল্পনায় তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের ওপর হামলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনেন সাংবাদিক নেতারা।

ছাত্রদলের ‘বিষফোঁড়া’ সৌরভপ্রিয় পালকে বহিষ্কার, চার নেতাকে ৪৮ ঘন্টা সময় 1

‘সম্পর্ক রাখা যাবে না’

বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) দিবাগত মধ্যরাতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, কেন্দ্রীয় সংসদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম মহানগর শাখা ছাত্রদলের সাবেক সহ সভাপতি সৌরভ প্রিয় পালকে প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হলো।’

ছাত্রদলের ‘বিষফোঁড়া’ সৌরভপ্রিয় পালকে বহিষ্কার, চার নেতাকে ৪৮ ঘন্টা সময় 2

সহ-সভাপতি পদমর্যাদায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির আজ এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তার সাথে কোনরূপ সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন।

চার নেতাকে ৪৮ ঘন্টা সময়

এদিকে একই সময়ে পাঠানো অপর এক বিজ্ঞপ্তিতে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সাবেক চার নেতাকে ৪৮ ঘন্টার সময় বেঁধে দিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এরা হলেন চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সহ সভাপতি বাপ্পি দে ও বিপ্লব চৌধুরী বিল্লু, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুকান্ত তালুকদার ও অপু চৌধুরী আকাশ।

ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সাবেক পদধারী নেতা হয়েও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আপনাদের বিরুদ্ধে কেন স্থায়ী সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না—এই মর্মে আগামী ৪৮ ঘন্টার মধ্যে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের উপস্থিতিতে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হলো।’

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির আজ এই নির্দেশনা প্রদান করেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

অফিস দখলের চেষ্টা, নারীদের ওপর হামলা

বুধবার (৩০ জুলাই) সোয়া সাতটার দিকে সৌরভপ্রিয় পালের নেতৃত্বে প্রায় অর্ধশত যুবক চট্টগ্রামে জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের কার্যালয়ে সংঘবদ্ধ হামলা চালায়। অফিস ভাঙচুরের পাশাপাশি এ সময় তারা নারীদের ওপরও হামলা চালায়। একপর্যায়ে চট্টগ্রাম মহানগর জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের মহিলা সম্পাদিকা দীপা মহাজনকে ব্যাপক মারধর করে দুর্বৃত্তরা। তারা ওই নারীকে পেটাতে পেটাতে প্রধান সড়কে নিয়ে আসে৷ ওই নারীর কাছ থেকে মোবাইল সেট ও স্বর্ণের চেইন কেড়ে নেওয়া হয়। পরে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক এক শীর্ষ নেতার নির্দেশে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহত দীপা মহাজনের চিকিৎসায়ও বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের নেতারা অভিযোগ করেন, হামলা ও ভাঙচুরে বিএনপি নেতা ও চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সহ সভাপতি সৌরভ প্রিয় পাল ছাড়াও অংশ নেন যুবদল নেতা ও কিশোর গ্যাং লিডার হিসেবে পরিচিত বাপ্পি দে, সাবেক ছাত্রদল নেতা অপু চৌধুরী আকাশ, সুকান্ত তালুকদার জুয়েল, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সঞ্জয় চক্রবর্তী মানিক, চকরিয়া পৌর বিএনপির সদস্য মিঠুন আচার্য্য, সীতাকুণ্ডের যুবদল নেতা মিঠুন বৈষ্ণব, সুব্রত আইচ ও রয়েল পালসহ আরও অনেকে।

পরে রহমতগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নওশাদের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সৌরভ প্রিয় পালের নেতৃত্বে দুর্বৃত্তদের জন্মাষ্টমীর অফিস কক্ষ থেকে বের করতে চাইলে তারা সনাতনী নেতাদের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

এর আগে গত ২৮ মে সদ্য বহিস্কৃত সাবেক ছাত্রদল নেতা সৌরভপ্রিয় পালের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ষষ্ঠ আদালতের বিচারক এসএম আলাউদ্দিন মাহমুদ ওই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কোতোয়ালী থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলায় (জিআর মামলা নম্বর ২৮(১১)২৩) আইনজীবীর মাধ্যমে বার বার সময়ের আবেদন করে যাচ্ছিলেন সৌরভপ্রিয় পাল। কিন্তু ধার্য্য তারিখেও সৌরভপ্রিয় পালের আইনজীবী সময়ের আবেদন করলে আদালত আবেদনটি নামঞ্জুর করেন। এরপর সৌরভপ্রিয়র বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। এই মামলায় সৌরভের আইনজীবী রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও চট্টগ্রামের ২৬ জন সাংবাদিককে আসামি করে মিথ্যা মামলা দায়েরের অভিযোগ রয়েছে।

সাংবাদিকদের ওপর হামলা

সাংবাদিক নেতারা অভিযোগ করেন, সাবেক ছাত্রদল নেতা সৌরভপ্রিয় পালের প্রত্যক্ষ পরিকল্পনায় তার অনুসারীরা গত ১ মে একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় চট্টগ্রামের সিনিয়র সাংবাদিকদের ওপর পূর্ব পরিকল্পিত হামলায় অংশ নেন। এর আগে তারা ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘোষণা দেন।

সাংবাদিক নেতারা অভিযোগ করেন, সৌরভপালের সহযোগী বিএনপির চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ‘আইনি কমিটির সদস্য’ পরিচয়দানকারী রেজাউল ইসলাম, সিএনজিচালক হান্নান রহিম ও তৌহিদসহ একদল দুর্বৃত্ত সংঘবদ্ধভাবে ফেসবুকে ‘কর্মরত সাংবাদিক’ ব্যানারে ১ মে আয়োজন করা একটি পিকনিক অনুষ্ঠান পণ্ড করার হুমকি দেন। ১ মে সকালে রেজাউলসহ সৌরভপালের সহযোগীরা সাংবাদিক প্রদীপ শীল ও খোরশেদুল আলম শামীমকে প্রচণ্ড মারধর করেন। পথচারীরা বিষয়টি দেখে এগিয়ে আসে এবং তাদের সহায়তায় রেজাউল ও তার একজন সহযোগীকে আটক করা হয়। পরে পুলিশ এসে রেজাউল ও তার সহযোগীকে খুলশী থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনায় কথিত বিএনপি নেতা রেজাউল চট্টগ্রামের সিনিয়র ২৬ জন সাংবাদিককে আসামি করে গত ১৩ মে একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। সাংবাদিকরা অভিযোগ করেন, তথ্য বিকৃতি করে সেই মামলায় বানোয়াট অভিযোগপত্র লেখা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে সখ্য

গত ১৮ জুন চট্টগ্রামে এক আওয়ামী লীগ নেতাকে পাশে বসিয়ে সংবাদ সম্মেলন করার ঘটনায় দলের অভ্যন্তরে ব্যাপক সমালোচিত হন নগর ছাত্রদলের সাবেক নেতা সৌরভপ্রিয় পাল। এমন ঘটনায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ছাড়াও বিব্রত হন বিএনপি নেতারাও। সাংবাদিকরা এ সময় সৌরভপ্রিয় পালকে আওয়ামী লীগ নেতার বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর না দিয়ে তড়িঘড়ি করে সংবাদ সম্মেলন ছেড়ে চলে যান।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm