রোববার রাত ১১টা থেকে শুরু। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হেফাজতে ইসলামের রাজনীতির মাঠে খেলে গেল ভিন্নরকম হাওয়া। জুনায়েদ বাবুনগরীর কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণার পরপরই জোয়ার উঠলো হেফাজতে ইসলামের আল্লামা শফিপন্থি শিবিরে।
বাবুনগরীর ঘোষণার এক ঘণ্টার মধ্যেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে হেফাজতের কমিটি ঘোষণা দিতে তৎপর হয়ে উঠলেন শফিপন্থিরা। তাদের এই তৎপরতাকে হুমকি হিসেবে দেখে রাতের আঁধারেই পাঁচ সদস্যের আহবায়ক কমিটি ঘোষণা দিয়ে বসলেন বাবুনগরী। নিজেকে আহবায়ক রেখে জুনায়েদ বাবুনগরী পাঁচ সদস্যের এই আহবায়ক কমিটিতে ঠাঁই দিলেন তারই আস্থাভাজন দুই হেফাজত নেতাসহ মোট চার নেতাকে।
এই আহবায়ক কমিটির প্রধান উপদেষ্টা হলেন জুনায়েদ বাবুনগরীর মামা আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। নুরুল ইসলাম জিহাদীকে রাখা হয় সদস্য সচিব পদে। বাবুনগরী ঘোষিত বিলুপ্ত কমিটিতেও জিহাদী ও মুহিব্বুল্লাহ একই পদে ছিলেন। এছাড়া এই কমিটিতে ‘অরাজনৈতিক গ্রহনযোগ্য’ ব্যক্তি হিসেবে মাওলানা সালাহ উদ্দিন নানুপুরী ও অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরীকে সদস্য ঘোষণা করা হয়। নুরুল ইসলাম জিহাদী নিজে এই কমিটি ঘোষণা করেন তার ব্যক্তিগত ফেসবুকে ভিডিওবার্তা প্রদানের মাধ্যমে।
এর আগে ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর ঢাক-ঢোল পিটিয়ে মাঠ গরম করে আল্লামা আহমদ শফিপন্থিদের কোনঠাসা করে কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করেছিলেন হেফাজতের বর্তমান আমীর আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী। কিন্তু মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় হেফাজতে ইসলামের এই কমিটি হোচট খেল রাজনীতির বেলাভূমিতেই। কোনো সুস্পষ্ট কারণ উল্লেখ না করেই ফেসবুক লাইভে এসে নিজ মুখেই এই কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করলেন বাবুনগরী। তাও মাত্র পাঁচ মাস নয় দিনের মাথায়।
এ ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টে গেল হেফাজত ইসলাম নিয়ে রাজনীতির গল্প। নেতৃত্ব শফিপন্থিদের হাতে যাওয়ার ভয়ে রাতারাতি বাবুনগরী আহবায়ক কমিটি ঘোষণা দিয়ে বসলেন।
হেফাজতের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণার পর আল্লামা শফিপন্থি হেফাজত শিবিরে উঠেছে জোয়ার। তারা ফের হেফাজতের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেছেন কৌশল প্রনয়ণ। বলা চলে, নিজেদের আধিপত্য ফিরে পেতে অস্তিত্ব জানান দিতে কোমর বেঁধে নামছেন তারা। ইতোমধ্যে আল্লামা শফির অনুসারীদের নিয়ে নতুন করে হেফাজতের কমিটি গঠনের ঘোষণাও দিয়ে বসলেন হেফাজতের একসময়ের সেকেন্ড ইন কমান্ড মাঈনুদ্দিন রুহী। তবে রাজপথে নয়, শফিপন্থি এই নেতার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে।
রোববার দিবাগত রাত ১২টার দিকে ফেসবুক লাইভে এসে হেফাজত ইসলামের কমিটি ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দেন হেফাজতের প্রথম কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মাঈনুদ্দীন রুহী। তার ঘোষণার শেষ দিকে লক্ষ্য করা গেছে দৃঢ়তাও।
এই ঘোষণার পর বুঝা গেল ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর হেফাজতের কমিটি গঠনের পর হেফাজতের যে গ্রুপটি কিছুটা চুপসে গিয়েছিল তারা আবারও নামছেন মাঠে। মূলত নানা বিতর্কের জন্ম দেওয়া মামুনুল হক গ্রেফতার হওয়ার সুযোগে আবারো সক্রিয় হলেন শফিপন্থিরা।
তবে শফিপন্থিদের নিয়ে মাঈনুদ্দিন রুহীর এই হেফাজত ঢেলে সাজানোর ঘোষণা কতটা ‘ধোপে টিকবে’ সেটা বুঝতে হলে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছু সময়।
মাওলানা মাঈনুদ্দীন রুহী ফেসবুক লাইভে বলেন, ‘২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর অবৈধ কাউন্সিলের মাধ্যমে হেফাজতের যে কমিটি গঠন করা হয়েছে সেটি সিন্ডিকেট কমিটি। রাজনৈতিক উচ্চাভিলাস ও হেফাজতের মুল লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে বিসর্জন এই কমিটি গঠন করা হয়। সাড়ে মাসের মাথায় বাস্তবতা উপলব্ধি করে হলেও এই কমিটি যে বিলুপ্ত করেছেন আমীর (বাবুনগরী) সাহেব এই সিদ্ধান্তকে আমি স্বাগত জানাই।’
নতুন কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়ে মাঈনুদ্দিন রুহী বলেন, ‘দেশবাসীকে আল্লামা আহমদ শফির মুলধারার হেফাজতে ইসলাম এবং সম্পূর্ণ অরাজনৈতিকভাবে দেশের উন্নয়ন, দেশের সমৃদ্ধি, দেশের স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে এবং ইসলামের প্রচার-প্রসার, ইসলামের তাহজীব তামাদ্দুনের সংরক্ষণের জন্য, ইসলামের আকীদা বিশ্বাস সংরক্ষণের জন্য হেফাজতে ইসলাম কাজ করবে। সেই লক্ষ্যে ইনশাআল্লাহ আল্লামা আহমদ শফি সাহেবের নীতি-আদর্শের হেফাজতে ইসলাম আমরা গঠন করবো।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের পূর্বসূরীরা যেভাবে ইসলামকে সংরক্ষণ করেছেন, ইসলামের ভাবধারা ইসলামের ভাবগাম্ভীর্যকে সংরক্ষণ করেছেন সেই পদাংক অনুসরণ করে আমরা হেফাজতে ইসলামের কমিটি গঠন করবো। ইনশাআল্লাহ আপনারা দেশবাসী আমাদের সাথে থাকবেন। ওলামায়েকেরাম আমাদের সাথে থাকবেন। কওমী ওলামায়েকেরাম ঐক্যবদ্ধ থাকবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেকোনো পরিস্থিতিতে যেকোনো বাধা ডিঙিয়ে আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাবো।’
এর আগে রোববার (২৫ এপ্রিল) রাত ১১টার দিকে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে সংগঠনটির আমীর আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে রাষ্ট্রীয় অতিথি হয়ে বাংলাদেশে আসা ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে আন্দোলনের নামে সহিংসতা চালিয়ে দেশজুড়ে সমালোচিত হয়েছে বাবুনগরীর হেফাজতে ইসলাম। সংগঠনটির ব্যানারে মোদী বিরোধী আন্দোলন করার ঘোষণা না দিলে এই হেফাজতের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদেরই সহিংসতায় নামানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এদের মধ্যে ঢাকা মহানগর হেফাজতের মহাসচিব মামুনুল হক সহিংসতায় নেতৃত্ব দেন বলেও রয়েছে অভিযোগ। সারাদেশে এ সহিংসতার ফলে নিহত হন প্রায় ২০ জন। থানা, ভূমি অফিসসহ সরকারি অফিসে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুরের মত সহিংসতা চালানো বাবুনগরীর নেতৃত্বাধীন হেফাজতের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে শুরু হয় সমালোচনা।
এর পরপরই নারী নিয়ে ঢাকার নায়াণগঞ্জের একটি রিসোর্টে মাওলানা মামুনুল হক ধরা পড়লে বাবুনগরীর হেফাজতের অহংকারের কফিনে ঠুকে যায় শেষ পেরাক।