চট্টগ্রাম ‘চুপচাপ’ সিলেটে শিবিরের ছাত্র মারধরের ঘটনায়, ঢাকা ও চবিতে বিক্ষোভ

কেন্দ্রের কর্মসূচি পালন করেনি চট্টগ্রামের তিন কমিটি

সিলেট এমসি কলেজে শিবিরের মারধর ও রগ কাটতে চাওয়ার প্রতিবাদে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটি বিক্ষোভ কর্মসূচি ও মশাল মিছিল করলেও চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলায় ঘোষিত নতুন কমিটি কোনো কর্মসূচি না দিয়ে চুপ থাকার নীতি নিয়েছে। নেতাদের কেউ কেউ বলেছেন, এই ঘটনা নিয়ে অনেক সন্দেহ তৈরি হয়েছে। আবার অনেকে বলছেন, চট্টগ্রামের কমিটিগুলো ‘শিবিরঘেঁষা’ বলে তারা কর্মসূচি দেয়নি। তবে এর মধ্যে শিক্ষার্থীর ওপর ছাত্রশিবিরের হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা।

সিলেট এমসি কলেজে শিক্ষার্থীকে শিবিরের মারধর ও রগ কাটতে চাওয়ার প্রতিবাদে কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটি। বৃহস্পতিবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাত ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে তারা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। কিন্তু চট্টগ্রামে কেন এই কর্মসূচি পালন করা হল না— এ নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে।

গত সোমবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) মধ্যরাতে চট্টগ্রাম মহানগর, দক্ষিণ ও উত্তরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিনটি কমিটি ঘোষণা করা হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিজাউর রহমানকে আহ্বায়ক ও সরকারি সিটি কলেজের শিক্ষার্থী নিজাম উদ্দিনকে সদস্যসচিব করে ৩১৫ সদস্যের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি ঘোষণার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জোবাইর হোসেনকে আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তৌহিদুল ইসলামকে সদস্যসচিব করে ৩২৭ সদস্যের চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা কমিটি ঘোষণা করা হয়। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইয়াছির আরফিন চৌধুরীকে আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী মো. রইছ উদ্দিনকে সদস্যসচিব করে ১১২ সদস্যবিশিষ্ট চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কমিটি ঘোষণা করা হয়।

কেন চুপচাপ চট্টগ্রাম?

কেন্দ্রঘোষিত কর্মসূচি কেন চট্টগ্রামে পালন করা হলো না— এ প্রসঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কমিটির আহ্বায়ক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইয়াছির আরফিন চৌধুরী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘গত দুদিন ধরে আমরা বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মসূচি পালন করেছি। তাতে সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তাছাড়া মহানগরের আহ্বায়ক রিজাউর ভাইও অসুস্থ। এসব কারণে আমরা এমসি কলেজের ঘটনায় কোনো কর্মসূচি পালন করিনি।’

আরফিন চৌধুরী বলেন, তাছাড়া এমসি কলেজের ঘটনা নিয়ে তো অনেকরকম কথা শোনা যাচ্ছে। অনেক সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তবু আগামীকাল হয়তো আমরা একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারি।’

চট্টগ্রামের কমিটিগুলো শিবিরঘেঁষা বলে এ ধরনের কর্মসূচি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে— কারও কারও এমন অভিযোগ আছে। এ প্রসঙ্গে আরফিন বলেন, ‘না, এরকম কিছু নয়।’

এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা কমিটির এক ‘ফেসবুক একাউন্ট’ থেকে দেওয়া এক মন্তব্যে বলা হয়, ‘বয়কট আজকের মিছিল। আমাদের বৈছাআর একজন ভাই অভিযোগ করলো তাকে মারছে, তার প্রতিবাদ না করে দোষ শিবিরের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।’

তবে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা কমিটির আহ্বায়ক জোবাইর হোসেন ফেসবুক পেইজের ওই বক্তব্য তাদের নয়— এমন মন্তব্য করে বলেন, ‘ফেসবুক পেইজটি কারা পরিচালনা করছে আমরা জানি না। ওই পেইজ থেকে দেওয়া কোনো বক্তব্যের দায়ভার আমরা নেবো না।’

এমসি কলেজের ঘটনায় চট্টগ্রামে কোনো কর্মসূচি কেন পালন করা হলো না— এমন প্রশ্নের জবাবে জোবাইর হোসেন বলেন, ‘কেন্দ্র থেকে আমাদের স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা হয়নি। কেন্দ্র থেকে আমাদের বলেনি যে, এই কর্মসূচি পালন করতে হবে। এছাড়া এমসি কলেজের প্রকৃত ঘটনা কী— সেটা যাচাই করার জন্যও আমরা অপেক্ষা করেছি।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে চট্টগ্রাম মহানগরের আহ্বায়ক রিজাউর রহমানের সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলেও তার সাড়া মেলেনি। পরে তাকে বার্তা পাঠিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম মহানগরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফ মাইনুদ্দিন চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘কেন্দ্র থেকে সদ্যঘোষিত কমিটি নিয়ে আমি সন্তুষ্ট না। আমার পোস্ট নিয়ে সন্তুষ্ট, কিন্তু আমার যারা সহযোদ্ধা, তাদের আমি এই কমিটিতে দেখিনি। এ কারণে আমি এই কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছিলাম। কিন্তু আমাদের যে প্ল্যাটফর্ম সেটাকে আমি ওন করি। এই জায়গা থেকে আমি বলবো, কেন্দ্রের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চট্টগ্রামে এমসি কলেজের ঘটনায় অবশ্যই আজ কর্মসূচি পালনের দরকার ছিল। কারণ আমরা ক্যাম্পাসে সব ধরনের সন্ত্রাস, মারধর ও হামলার বিপক্ষে। চট্টগ্রামে কেন কর্মসূচি পালন করা হলো না— এটা নীতিনির্ধারক যারা আছেন তারা বলতে পারবেন।’

চবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ

সিলেটের এমসি কলেজে শিক্ষার্থীর ওপর ছাত্রশিবিরের হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার (২০ ফেব্রুয়ারী) রাত সাড়ে নয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্টে এই বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়। চট্টগ্রামভিত্তিক অন্যতম সমন্বয়ক খান তালাত মাহমুদ রাফিও একই ঘোষণা দেন।

শিক্ষার্থীকে শিবিরের মারধরের প্রতিবাদে এবং হামলাকারীদের বিচারের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিলে শিক্ষার্থীরা ‘এমসি কলেজে হামলা হলে আবরার তোমায় মনে পড়ে, জ্বালোরে জ্বালো আগুন জ্বালো, আমার ভাই আহত কেন প্রশাসন জবাব চাই, আমার ভাই কবরে খুনি কেন ভারতে, সন্ত্রাসীদের ঠিকানা এই বাংলায় হবে না’ সহ বেশ কিছু স্লোগান দেয়’।

এ সময় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সহ-সমন্বয়ক আরিয়ান রাকিব বলেন, ‘আমরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সকল হামলার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবো। এমসি কলেজে যে হামলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনকে যথাযোগ্য ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে আমরা কঠোর আন্দোলনে নামবো।’

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ রাকিব বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে যে অরাজকতার পরিবেশ ছিলো বিপ্লব পরবর্তী সময়ে তা মুছে ফেলবো। কিন্তু আমরা তা পারিনি। আমাদের বিপ্লব ছিলো বাকস্বাধীনতার বিপ্লব। যদি আমরা দেশ গঠনে সচেষ্ট থাকতে চাই তাহলে আমাদের এক হয়ে থাকতে হবে। না হলে স্বৈরাচারী নিয়ম আবার এ দেশে ফিরে আসবে।’

চবির সহ-সমন্বয়ক রশিদ দিনার বলেন, ‘আমরা একটা কথা বলি ছাত্রদল ও শিবির যে দিকে ধাবিত হচ্ছে আমরা অতি শীঘ্রই খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যাবো। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দখলদারীর রাজনীতি থেকে এদেশকে রক্ষা করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। যারা দখলদারীর রাজনীতি করবে তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

এমসি কলেজের সেই ঘটনা

বুধবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে মিজানুর রহমান রিয়াদ নামের এক শিক্ষার্থীকে রাতভর পিটিয়ে আহত করা হয়। আহত শিক্ষার্থীর অভিযোগ, তাকে মারধর করেছে শিবির কর্মীরা। হামলাকারীদের তিনি আগে থেকে চেনেন।

তিনি অভিযোগ করেন, বুধবার রাত ১২টার দিকে এমসি কলেজ ছাত্র শিবিরের সেক্রেটারি জওহর লোকমান মুসান্নার উপস্থিতিতে তাকে রড দিয়ে মারধর করা হয়েছে। এর একপর্যায়ে তার রগ কাটার চেষ্টাও হয়।

গুরুতর আহত মিজানুর রহমান রিয়াদ এমসি কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি ইসলামী সংগঠন তালামীযে ইসলামিয়ার সক্রিয় কর্মী।

এমসি কলেজ ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইসমাইল খান এ ঘটনার তার সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করলেও তালামীযে ইসলামিয়া এমসি কলেজ শাখার সভাপতি আলবাব হোসেন জানান, শিবির ক্যাম্পাসে ভিন্নমতের অন্য কোনো সংগঠনকে প্রশ্রয় দিতে চাচ্ছে না। শুধু ফেসবুকে একটি মন্তব্যের মতো তুচ্ছ ঘটনায় সংগঠনটির সদস্যরা বেপরোয়া আচরণ করে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এমসি কলেজের ঘটনায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রশ্ন তুলে বলেছে, ‘ক্যাম্পাসে আবার রগকাটার রাজনীতি ফিরে এসেছে কিনা?’

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm