চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির (বার অ্যাসোসিয়েশন) ২০২৪-২৫ মেয়াদের নির্বাচন এবার রূপ নিয়েছে এক নজিরবিহীন প্রক্রিয়ায়—যেখানে ২১টি পদের একটিতেও কোনো ভোট হচ্ছে না। সমিতির ১৩২ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবার একক প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে সবাই বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়ে যাচ্ছেন— এখন যার ঘোষণা দেওয়া কেবল বাকি। ইতিমধ্যে মোট ২১টি পদের মধ্যে বিএনপি ১৪টি ও জামায়াত সমর্থিত আইনজীবীরা ৭টি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছেন।
আইনজীবী সমিতির ভোটারের সংখ্যা যেখানে ৫ হাজার ৪০৪ জন, সেখানে কোনো প্রকার ভোট গ্রহণ না হওয়া এবং প্রতিটি পদে কেবল একক প্রার্থী দিয়ে পদ ভাগাভাগি করে নেওয়াকে সমিতির প্রবীণ সদস্যরা ‘গণতন্ত্রহীনতার উদ্বেগজনক লক্ষণ’ হিসেবে দেখছেন।
সবই ছিল আনুষ্ঠানিকতা
নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন ছিল বৃহস্পতিবার (১০ এপ্রিল)। সেদিন প্রত্যেক পদের বিপরীতে কেবল একজন করে প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। পরদিন শুক্রবার (১১ এপ্রিল) যাচাই-বাছাই শেষে সকল মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। আগামী ১৬ এপ্রিল ভোট অনুষ্ঠানের দিন নির্ধারিত থাকলেও ‘প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায়’ এখন শুধু তাদের ‘বিজয়ী’ ঘোষণার আনুষ্ঠানিকতাটুকু বাকি আছে।
নির্ধারিত ভোটের তিন দিন আগে শনিবারই (১২ এপ্রিল) নির্বাচন পরিচালনা কমিটি ফলাফল ঘোষণার পদক্ষেপ নিয়েছিল। তবে শনিবার সন্ধ্যায় মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তা তারিক আহমেদ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা এখনও ফলাফল ঘোষণা করিনি। আগামীকাল রোববার আমরা পুরো বিষয়টি বসবো। তারপরই ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেবো।’
বিনাভোটে ‘অটোপাস’ যারা
১৩২ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথমবারের মতো ২১টি পদেই ভোট ছাড়াই জয়ী হতে যাচ্ছেন একমাত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দেওয়া ব্যক্তিরা। সবচেয়ে লক্ষণীয়, জয়ী হতে যাওয়া সবাই বিএনপি ও জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিত।
যে ১৪টি পদে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা পদ নিলেন— সভাপতি আবদুস সাত্তার, সাধারণ সম্পাদক হাসান আলী চৌধুরী, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কাজী মো. সিরু, অর্থ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, পাঠাগার সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম, সাংস্কৃতিক সম্পাদক আশরাফী বিনতে মোতালেব, ক্রীড়া সম্পাদক মঞ্জুর হোসেন এবং সদস্য আহসান উল্লাহ, আসমা খানম, বিবি ফাতেমা, মেজবাহ উল আলম, রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী, রাহিলা গুলশান ও সাজ্জাদ কামরুল হোসেন।
যে ৭টি পদে জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত প্রার্থীরা পদ নিলেন— সহসভাপতি আলমগীর মোহাম্মদ ইউনুস, সহসাধারণ সম্পাদক ফজলুল বারী, তথ্য ও প্রযুক্তি সম্পাদক আবদুল জব্বার এবং সদস্য শাহেদ হোসেন, হেলাল উদ্দিন, রোবায়তুল করিম ও মোহাম্মদ মোরশেদ।
চট্টগ্রাম বারে বিরোধের নতুন অধ্যায়
বৃহস্পতিবার (১০ এপ্রিল) মনোনয়নপত্র সংগ্রহের শেষ দিনে আওয়ামী লীগ ও এলডিপি সমর্থিত আইনজীবীরা ফরম তুলতে গেলে বাধার সম্মুখীন হন। তাদের অভিযোগ, বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত আইনজীবীরা তাদের ফরম সংগ্রহে বাধা দেন এবং শারীরিকভাবে হেনস্তা করেন। ফলে তারা মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি। এলডিপি সমর্থিত আইনজীবী শাহাদাত হোসেন সভাপতি পদের জন্য ফরম নিতে গেলে তাকে ধাক্কা দিয়ে তারা বের করে দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন আরও অনেক আইনজীবী। হেনস্তার এসব বিষয়ে ওইদিনই আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবী সভাপতি প্রার্থী আবদুর রশিদ ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ফখরুদ্দিন চৌধুরীসহ চারজন আইনজীবী সমিতির অ্যাডহক কমিটির আহ্বায়ক মকবুল কাদের চৌধুরীর কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
৪ বার কমিশন গঠন, ৫ পদত্যাগ
গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির (বার) নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রথমবারের মতো একটি পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। তবে ওই কমিশনের সদস্যদের নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে, কমিশনে এমন ব্যক্তিরা আছেন, যারা অতীতে ‘স্বৈরশাসনের সহযোগী’ ছিলেন। সমালোচনার মুখে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা হয়। পরবর্তী সময় আরও দুইবার নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। সবশেষ, চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সোলায়মানকে প্রধান করে চতুর্থবারের মতো নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়।
এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই শেষে ২১টি পদের বিপরীতে ৪০ জনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। তবে ভোটের মাত্র কয়েক দিন আগে নির্বাচন কমিশনের প্রধানসহ পাঁচ সদস্য একযোগে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্র জমা দেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সোলায়মান এবং সদস্যরা—উত্তম কুমার দত্ত, তারিক আহমদ, সাম্যশ্রী বড়ুয়া ও নুরুদ্দিন আরিফ চৌধুরী। তারা পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন, নির্বাচন ঘিরে দুই পক্ষের দাবির কারণে নির্বাচন পরিচালনা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
পদত্যাগের পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে তারা জানান, আওয়ামী লীগ-সমর্থিত সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ নির্বাচনকালে নিরাপত্তার জন্য সেনাবাহিনী ও বিজিবি মোতায়েনের দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশন ও বার কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন করে। অপরদিকে, বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত আইনজীবী ঐক্য পরিষদ কমিশনের কাছে পাল্টা অভিযোগ দেয়, যাতে সমন্বয় পরিষদের প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিলের দাবি জানানো হয়। এ ধরনের পাল্টাপাল্টি দাবির ফলে কমিশনের পক্ষে নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পরে ১৬ ফেব্রুয়ারি একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করে ১৬ এপ্রিল নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে মনোনয়নপ্রক্রিয়ায় বাধা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকায় ভোটের আশা অঙ্কুরেই শেষ হয়ে যায়। ফলে নির্বাচন হয়ে পড়ে একক প্রার্থিতার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ঘোষণায়।
সোনালি ইতিহাসে কালো দাগ
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির ইতিহাসে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বড় ধরনের কোনো বিরোধ দেখা যায়নি। গত ১৬ বছরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আইনজীবীরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন এবং গণতান্ত্রিকভাবে ভোট দিয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তবে এবার, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিকৃতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ সমিতির ঐতিহ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে মনে করছেন সমিতির বেশিরভাগ সদস্যই।
অনেক আইনজীবী মনে করছেন, এই ঘটনায় আইনজীবী সমিতির ইতিহাসে বড় ধরনের দাগ পড়েছে। সমিতির মধ্যে দলীয় রাজনীতির এমন প্রকাশ্য ও জোরপূর্বক প্রকাশ আগে কখনও দেখা যায়নি।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির প্রবীণ সদস্যরা বলছেন, ‘এই নির্বাচনী পরিবেশে যারা পদে বসতে যাচ্ছেন, তাদের নৈতিক ভিত্তি ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। বার নির্বাচন শুধু পদের বিষয় নয়; এটি একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা। আর যখন সেই সংস্কৃতি বাধা, বিভাজন ও একচেটিয়া পরিকল্পনায় রূপ নেয়, তখন সেটা গোটা বিচারব্যবস্থার জন্যই উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে।’
তবে আইনজীবীদের অনেকে অভিযোগ করেছেন, গত বছরের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা ‘স্বৈরাচারের দোসর’ হিসেবে সরাসরি কাজ করেছেন। তাদের অভিযোগ, গত বছরের ৩১ জুলাই চট্টগ্রাম আদালতে কর্মসূচি পালনকালে ‘শেখ হাসিনার দোসর আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা’ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান। পরে ৪ আগস্ট নগরীর নিউ মার্কেট এলাকায় পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হামলা চালালে আন্দোলনে অংশ নেওয়া নিরীহ ছাত্ররা আদালত ভবনে আশ্রয় নিলে তাদের ওপর হামলা হয় আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের নেতৃত্বে।
সিপি