দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। প্রায় দেড় দশকের দমন–পীড়ন, গুম-খুন এবং দলীয় স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের গণআন্দোলন জয়ী হয়। এ ঘটনাকে অনেকে বলছেন ‘ইতিহাসের বাঁকবদল’। তবে এ বিজয়ের মাঝেই যে নেতৃত্ব উঠে এসেছে, তা শুধু নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা নয়, বরং নেতৃত্বতত্ত্বের এক কার্যকর উদাহরণ।
জয়োল্লাসের সেই সময়েই একটি ভাষণ সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে। সুর ছিল শান্ত, ভাষা ছিল সংযত, কিন্তু বার্তাটি ছিল সুদূরপ্রসারী; প্রতিশোধ নয়, বরং ঐক্য ও সহমর্মিতার। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ডাক— এটি ছিল এক নেতার পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা। যিনি জানেন রাজনৈতিক বিজয় তখনই টেকসই হয় যখন তা নৈতিক উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এ নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
রাজনৈতিক যোগাযোগের আধুনিক ধরনে, নেতার ভাষা কেবল শোনার নয়, তা একটি দর্শন—একটি রূপরেখা। তারেক রহমানের ভাষণে প্রতিহিংসা বা উত্তেজনার সুর ছিল না, বরং ছিল দায়িত্বশীলতার অভিব্যক্তি। একে তুলনা করা যেতে পারে দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলা ক্ষমতায় আসার পর ‘truth and reconciliation‘ ধারণার সঙ্গে। বিজয়ের পর প্রতিশোধ না নেওয়ার মনোভাব ও ইতিহাসে নেতৃত্বের উচ্চতম পর্যায়ের চিহ্ন হয়ে থাকে।
তারেক রহমানের এই প্রস্তুতি হঠাৎ নয়। ২০২৩ সালেই তিনি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ৩১ দফা রূপরেখা দিয়েছিলেন। যেখানে দুকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, বিচারিক সংস্কার, সংবিধানের ৭০ ধারা সংশোধন এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। এই কাঠামোগত ভাবনা একধরনের institutional imagination, যা শুধু ক্ষমতাবদল নয়, রাষ্ট্রচিন্তারই পুনঃসংজ্ঞা।
আলোচ্য সময়ের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো বিএনপি ও তাঁর নেতৃত্বের ‘sacrifice model of leadership’। ঐক্যমতের স্বার্থে এমনকি ‘দুবারের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না’— এই প্রস্তাব মেনে নেওয়ার ঘটনা। যা নিজেদের সম্ভাব্য সুবিধার বিরুদ্ধে যায়, রাজনীতিতে তা এক বড় দৃষ্টান্ত। এমন দৃষ্টিভঙ্গি দলীয় অহমিকা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নেতৃত্বের পরিচয়।
আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন শুধু স্লোগান নয়, বরং একটি পরিকল্পিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপরেখার দিকেই ইঙ্গিত করছে। তারেক রহমান জানিয়েছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও বিএনপি এককভাবে নয়, জাতীয় সরকার গঠনে অগ্রাধিকার দেবে। বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিল্পী, শিক্ষক, আইনজীবীসহ অরাজনৈতিক মেধাবীদের অংশগ্রহণে উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব এ নেতৃত্বের উদারতা এবং আত্মবিশ্বাসকেই সামনে আনে।
বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে যেখানে পোল্যান্ড, তুরস্ক কিংবা শ্রীলঙ্কায় রাজনৈতিক উত্তরণ অনিশ্চয়তায় ঘেরা, সেখানে নেতৃত্বের এ দৃষ্টিভঙ্গি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক স্বতন্ত্র অবস্থান সৃষ্টি করতে পারে। যেমন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’— এ স্লোগান কেবল একটি কূটনৈতিক অবস্থান নয়, বরং একটি আত্মমর্যাদাবোধের ঘোষণা। অর্থাৎ প্রভুত্ব নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
নেতৃত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয় গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায়। যেখানে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকার আমলে সাংবাদিকরা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় জর্জরিত ছিলেন, সেখানে তারেক রহমান নিজেকে নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশেও বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন নন। গণমাধ্যমকে সহযোগী হিসেবে দেখতে চাওয়া এ দৃষ্টিভঙ্গি নেতৃত্বের ভিন্ন মাত্রা।
তৃণমূল কাউন্সিল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব নির্বাচন এবং দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করার দৃষ্টান্ত বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করছে। এটি প্রমাণ করে, বিএনপির ক্ষমতায় আগমনের সম্ভাবনা থাকলেও, তারা নেতৃত্বে গণতন্ত্রের চর্চা নিয়েই এগোচ্ছে। তিনি নিজ দলে যেমন গণতন্ত্র চর্চা করেন, একইভাবে দেশের গণতন্ত্র রক্ষায়ও তিনি থাকবেন বদ্ধপরিকর।
সবশেষে, নেতৃত্বের মূল্যায়ন হয় সংকটে তাঁর অবস্থান দিয়ে। ৫ আগস্টের পর দেশের শৃঙ্খলা বজায় রাখা, প্রতিহিংসার বদলে পুনর্গঠনকে প্রাধান্য দেওয়া এবং একটি ঐক্যবদ্ধ ও গঠনমূলক রাষ্টব্যবস্থার রূপরেখা দেওয়ার মাধ্যমে তারেক রহমান যে নেতৃত্ব প্রদর্শন করেছেন তা দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। তবে তিনি সফল হবেন কিনা তা ভবিষ্যতের হাতে। তিনি পথ দেখাচ্ছেন। অনেকেই বলছেন, নতুন বাংলাদেশ তাঁর হাত ধরেই এগিয়ে যাবে।
১৯৭৫-এ একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশালের পতনের পর জিয়াউর রহমানের আগমন ছিল ইতিহাসের একটি জনআকাঙ্খার ফলাফল। রাষ্ট্রের নেতৃত্বশূন্যতা ও রাজনৈতিক শূন্যতার মুহূর্তে তিনি কেবল রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেননি, বরং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ উন্মোচনের মধ্যদিয়ে নিজেকে ঐতিহাসিকভাবে অনন্য জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করেন। স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সরাসরি অংশগ্রহণ এবং ৭ নভেম্বরের সৈনিক-জনতার অভ্যুত্থানে জাতির কাছে তিনি ‘ত্রাণকর্তা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
পলিটিক্যাল হিস্টোরি থিওরিতে বলা হয়, সংকটে যখন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ব্যর্থ হয়, তখনই ইতিহাস নতুন নেতৃত্বকে আহ্বান জানায় এবং সেই নেতৃত্ব কেবল তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান নয়, বরং নতুন রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার প্রতীক হয়ে উঠে। আজকের সময়ে তারেক রহমানকে ঘিরে গড়ে উঠা রাজনৈতিক বয়ান সেই তত্ত্বকেই অনুসরণ করছে। বিএনপি-সমর্থিত রাজনৈতিক বলয়ে তিনি উপস্থাপিত হচ্ছেন জিয়াউর রহমানের আদর্শিক উত্তরসূরি এবং ফ্যাসিস্ট শাসনের বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে।
এ ন্যারেটিভ কেবল আবেগনির্ভর নয়; বরং এটি একটি কৌশলগত ইতিহাস-সংশ্লেষ, যেখানে অতীতের নেতৃত্বের সঙ্গে বর্তমান সংকটের সমান্তরাল টেনে জনগণের রাজনৈতিক কল্পনায় জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা হয়। এটি ইতিহাসের একটি সাধারণ প্রবণতা। যেমনটি আমরা দেখেছি নেহরু-ইন্দিরা-রাজীব কিংবা মার্কিন রাজনীতিতে কেনেডি পরিবারের ক্ষেত্রে।
বিশ্ব রাজনীতিতে ‘Cold War Politics’-এর সময় যেমন বৈদেশিক বলয়—বিশেষত মার্কিন, চীন ও ভারতীয় প্রভাব—বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, তেমনি আজকের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও অভিন্ন রূপ নিচ্ছে। চীন-মার্কিন-ভারত দ্বন্দ্বের নতুন মেরুকরণ বাংলাদেশকে আবারও এক রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে। এ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কোনো নেতৃত্বের বৈধতা তখনই টিকে থাকে, যখন তা অভ্যন্তরীণ জনসমর্থন ও বহির্বিশ্বের কৌশলগত গ্রহণযোগ্যতার সমন্বয় ঘটাতে পারে।
তারেক রহমানকে ‘পরিবর্তনের প্রতীক’ হিসেবে যে রাজনৈতিক বয়ান নির্মিত হচ্ছে, তা একাধিক মাত্রায় সক্রিয়। একদিকে দেশে দীর্ঘসময় ধরে জমে ওঠা রাজনৈতিক শূন্যতা, গণতান্ত্রিক অবদমন ও জনরোষ তাঁর নেতৃত্বকে একটি বিকল্প এবং উৎকর্ষ সমাধানের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে; অন্যদিকে তাঁর পিতার নেতৃত্বাধীন ঐতিহাসিক সময়ের সঙ্গে সমান্তরাল টেনে, বর্তমান সংকটে তারেক রহমানকে একটি ধারাবাহিক ইতিহাসের উত্তরসূরি হিসেবে উপস্থাপন করার সময় সমাগত।
এ কৌশলটি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন নয়। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় গণঅভ্যুত্থানের পর, রাজনৈতিক অচলাবস্থার মাঝে অনুড়া কুমারা দিশানায়েকের উত্থানও এমন একটি ঐতিহাসিক পুনরাবৃত্তির কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেখানে তিনিও নিজেকে এক নতুন বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে তুলে ধরেন, যিনি অতীতের শাসনের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের পুনর্গঠনের বার্তা দেন। তারেক রহমানের নেতৃত্ব ঘিরে যে বয়ান গড়ে উঠছে, সেটিও অনুরূপ একটি ইতিহাসতাত্ত্বিক কাঠামোতে নির্মিত—যেখানে অতীতের গৌরবকে পুনঃস্মরণ, বর্তমানের ক্ষোভকে আশার ভাষায় অনুবাদ এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি নৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা দৃশ্যমান।
এটি নিছক আবেগনির্ভর জনতুষ্টিকরণ নয়; বরং এটি একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক ইতিহাসচর্চার অংশ—যার মূল লক্ষ্য হলো, নেতৃত্বের বৈধতা তৈরির জন্য ইতিহাসের পুনঃব্যাখ্যার মধ্যদিয়ে একটি সমান্তরাল সময়রেখা গড়ে তোলা। শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়, তখন জনগণের আশা ব্যক্তিগত নেতৃত্বের প্রতি কেন্দ্রীভূত হয়—ঠিক সেভাবেই, বাংলাদেশের বর্তমান সংকটে তারেক রহমান একটি ‘ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন।
যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!