বন্দরে ‘সাইফে’র ১৬ বছরের চক্র ভেঙে ড্রাইডকের দুর্দান্ত সূচনা

এনসিটিতে এক সপ্তাহেই রেকর্ড হ্যান্ডলিং

নৌবাহিনী পরিচালিত চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল) দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র এক সপ্তাহেই চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) কন্টেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে লক্ষণীয় অগ্রগতি দেখা গেছে। ৭ জুলাই থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত সাত দিনের ব্যবধানে গড়ে প্রতিদিন ২২৫ টিইইউএস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একক) বেশি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ড্রাইডকের সাত দিনের হিসাব

গত ৭ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম ড্রাই ডক এনসিটির কার্যক্রমের দায়িত্ব গ্রহণ করে। ওই সাত দিনে ১০টি জাহাজের কনটেইনার লোডিং-আনলোডিং সফলভাবে সম্পন্ন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে এনসিটির চারটি জেটিতে একযোগে চারটি জাহাজে অপারেশন চলছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ড্রাইডক দায়িত্ব নেওয়ার আগে ১ জুলাই থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত সাইফ পাওয়ারটেক পরিচালিত এনসিটিতে দৈনিক গড়ে হ্যান্ডলিং হয়েছিল ২ হাজার ৯৫৬ টিইইউএস। আর ৭ জুলাই থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম ড্রাইডকের অধীনে দৈনিক গড় হ্যান্ডলিং বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৮১ টিইইউএস।

বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে যে পারফরম্যান্সে উন্নতি এসেছে, তা সময় ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনবল ব্যবহার এবং অপারেশনাল কার্যকারিতার একটি দৃষ্টান্ত। এই গতি ধরে রাখতে পারলে দেশের আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ায় চট্টগ্রাম বন্দর আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।’

বিতর্কিত সাইফ পাওয়ারটেকের বিদায়

৬ জুলাই ২০২৫ ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। ওইদিন সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের সঙ্গে বন্দরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় এবং অবসান ঘটে প্রায় দেড় দশক ধরে চলা এই প্রতিষ্ঠানের ‘একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের’। বিতর্কিত এই প্রতিষ্ঠানটির জায়গায় টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পায় নৌবাহিনী পরিচালিত সংস্থা চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড। ৭ জুলাই থেকে ছয় মাসের জন্য এনসিটির দায়িত্ব গ্রহণ করে ড্রাইডক।

প্রথমে পরিকল্পনা ছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজে টার্মিনাল চালাবে। কিন্তু পরে সরকারের পক্ষ থেকে নৌবাহিনীকে দায়িত্ব দিতে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। তবে আইনি জটিলতার কারণে সরাসরি নৌবাহিনীকে না দিয়ে তাদের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান ড্রাইডকের হাতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

বহু বছর পর বন্দরের এই রদবদলের পেছনে দীর্ঘদিনের অস্বচ্ছ চুক্তি, ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠতা এবং নানা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে সাইফ পাওয়ারটেকের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, সাইফ পাওয়ারটেকের মালিক তরফদার রুহুল আমিন গত ১৬ বছরে পাচার করেছেন ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

২০০৫ সালে যাত্রা শুরু করা সাইফ পাওয়ারটেক ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বন্দরের যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, কনটেইনার হ্যান্ডলিংসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম একচেটিয়া পরিচালনার সুযোগ পায়।

সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার মো. রুহুল আমিনের ঘনিষ্ঠতা ছিল সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক সাংসদ নূর-ই-আলম চৌধুরী, এম এ লতিফ, সামশুল হক চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের মতো ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে। এই রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ব্যবহার করে বছরের পর বছর টেন্ডার ছাড়াই সাইফ পাওয়ারটেকের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করেছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ। এমনকি যখন টেন্ডার হতো, তখনও শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হতো যাতে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারে।

১০ হাজার কোটি টাকার পাচারের অভিযোগ

সাইফ পাওয়ারটেকের বিরুদ্ধে রয়েছে বিপুল দুর্নীতি, অর্থপাচার ও শেয়ারবাজারে জালিয়াতির অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, গত ১৬ বছরে তরফদার রুহুল আমিন দেশ থেকে পাচার করেছেন ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

২০২২ সালে দুবাইভিত্তিক সাফিন ফিডার কোম্পানির সঙ্গে কথিত সমঝোতার ঘোষণা দিয়ে শেয়ারবাজারে মূল্য বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে খোলা ‘সাইফ মেরিটাইম এলএলসি’ নামের এক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর নিয়েও চলছে তদন্ত।

এখন সরকারের একাধিক সংস্থা সাইফ পাওয়ারটেকের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, রাজস্ব ফাঁকি এবং প্রভাব খাটিয়ে সরকারি কার্যাদেশ নেওয়ার অভিযোগে অনুসন্ধান চালাচ্ছে।

টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে না দেওয়ার আন্দোলনের আড়ালে?

সাম্প্রতিক সময়ে এনসিটি টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরদের হাতে না দেওয়ার দাবিতে একটি পক্ষ সোচ্চার হলেও অনেকে মনে করছেন, এর পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল সাইফ পাওয়ারটেককে টিকিয়ে রাখা।

এমন প্রেক্ষাপটে নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন একটি হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট ফাঁস করেন, যেখানে সাইফ পাওয়ারটেকের এমডি রুহুল আমিন বন্দর অচল করার জন্য অর্থ ঢালার নির্দেশ দেন—এমন বিস্ফোরক তথ্য উঠে আসে।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm