বিশ্বের দশম উচ্চতম এবং অন্যতম বিপদসংকুল পর্বতশৃঙ্গ অন্নপূর্ণা-১ জয় করেছেন চট্টগ্রামের পর্বতারোহী ডা. বাবর আলী। আজ ৭ এপ্রিল ভোরে, ৮,০৯১ মিটার উচ্চতার এই ভয়ঙ্কর শৃঙ্গে পৌঁছে ইতিহাস গড়েন তিনি। বাংলাদেশের পতাকা প্রথমবারের মতো উড়লো এই পর্বতে।
অভিযানের ব্যবস্থাপক ফরহান জামান গণমাধ্যমকে বাবরের সাফল্যের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। অভিযানের আউটফিটার প্রতিষ্ঠান মাকালু অ্যাডভেঞ্চারের সত্ত্বাধিকারী মোহন লামসালের সূত্রে এই তথ্য জানা যায়। বাবরের সাথে ছিলেন অভিজ্ঞ শেরপা গাইড ফূর্বা অংগেল শেরপা।
পর্বতারোহণ সংগঠন ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স, যা বাবর আলী নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছেন, আজ দুপুরে একটি ফেসবুক পোস্টে লেখে, “লাখো শুভাকাঙ্ক্ষীর প্রার্থনায় সাড়া দিয়েছেন স্রষ্টা। বঙ্গসন্তান বাবর অন্নপূর্ণার শীর্ষে পৌঁছেছেন—লাল-সবুজ পতাকা প্রথমবারের মতো উড়েছে সেই মহাশৃঙ্গে।”
অভিযান শুরু হয় ২৪ মার্চ বাবরের নেপাল যাত্রার মধ্য দিয়ে। কাঠমান্ডু থেকে পোখারা, তারপর গাড়ি ও হেঁটে তিনি ২৮ মার্চ পৌঁছান বেসক্যাম্পে। উচ্চতায় অভিযোজনের জন্য বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থানের পর ৩ এপ্রিল শুরু হয় চূড়ান্ত আরোহন। ৬ এপ্রিল রাতেই ক্যাম্প-৩ থেকে শুরু হয় চূড়ার পথে যাত্রা—যেখানে টানা ১৬০০ মিটার উচ্চতা পাড়ি দিতে হয়। অবশেষে ৭ এপ্রিল ভোরে বাবর সফলভাবে পৌঁছান শিখরে।
অন্নপূর্ণা-১ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি পর্বত। একসময় এর মৃত্যুহার ছিল প্রায় ৩২%! ২০২3 সাল পর্যন্ত ৫১৪ জন এই শৃঙ্গ জয় করলেও মৃত্যু হয়েছে ৭৩ জনের। ১৯৫০ সালে ফ্রান্সের দুই পর্বতারোহী প্রথম অন্নপূর্ণা-১ সামিট করেন, যা ছিল মানব ইতিহাসে প্রথম আট হাজারি সামিট।
এই সাফল্যের মাধ্যমে বাবর আলী নতুন অধ্যায় যুক্ত করলেন বাংলাদেশের পর্বতারোহণ ইতিহাসে। এর আগে ২০২৪ সালে তিনি একই অভিযানে এভারেস্ট ও লোৎসে জয় করে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে নজির স্থাপন করেছিলেন। ২০২২ সালে আমা দাবলামের মতো টেকনিক্যাল পর্বত জয় করে প্রথম বাঙালি পর্বতারোহী হিসেবে নাম লেখান।
পর্বতারোহী হলেও বাবর পেশায় একজন চিকিৎসক এবং লেখক। তাঁর লেখা বইয়ের মধ্যে রয়েছে ম্যালরি ও এভারেস্ট, পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা, সাইকেলের সওয়ারি, ও এভারেস্ট ও লোৎসে শিখরে।
তিনি ভারতের দীর্ঘতম কাশ্মীর-থেকে-কন্যাকুমারী সড়ক সাইক্লিং করেন, পায়ে হেঁটে পাড়ি দেন শ্রীলঙ্কা, এমনকি বাংলাদেশের ৬৪ জেলা হেঁটে ঘুরেছেন পরিবেশ বার্তা ছড়াতে।
অভিযান ব্যবস্থাপক ফরহান জামান বলেন, “বাবরের এই সাফল্য বাংলাদেশের জন্য গর্বের। স্পন্সরের অভাবে এবার একটি পর্বতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়েছে। তবে আমরা আশাবাদী, ভবিষ্যতে বাবরের পদযাত্রা আরও অনেক দূর যাবে।”
এই অভিযানে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে ভিজ্যুয়াল নিটওয়্যার্স লিঃ, ভিজ্যুয়াল ইকো স্টাইলওয়্যার, এডিএফ এগ্রো, ফ্লাইট এক্সপার্ট, এভারেস্ট ফার্মাসিউটিক্যালস ও ব্লু জে।
উল্লেখ্য, এই বছরই অন্নপূর্ণা-১ শৃঙ্গ জয়ের ৭৫ বছর পূর্তি বা প্ল্যাটিনাম জুবিলি। এমন ঐতিহাসিক বছরে বাংলাদেশের প্রথম জয় – বাবর আলীর নাম আজ অন্নপূর্ণার গায়ে লেখা হয়ে রইল সাহসের অক্ষরে।
সিপি