আতাউল্লাহ গ্রেপ্তারেই শেষ হচ্ছে না আরাকানের আরসা অধ্যায়

৪৮ বছর বয়সী আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনি, যিনি সাধারণত আতাউল্লাহ বা আতা উল্লাহ নামে পরিচিত— তাকে কেউ কেউ ‘মুজাহিদ’, আবার অনেকে ‘দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী’ হিসেবে বিবেচনা করেন। আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) প্রধান নেতা আতাউল্লাহ বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জে গ্রেপ্তার হওয়ার পর আরসার কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, মিয়ানমারের উত্তর রাখাইন রাজ্যে সক্রিয় রোহিঙ্গা বিদ্রোহী সংগঠন আরসার নেতৃত্বে পরিবর্তন আসতে পারে এবং নতুন নেতৃত্বের অধীনে সংগঠনটি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আতাউল্লাহর গ্রেপ্তার রোহিঙ্গা সম্প্রদায় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ঘটনা।

যে মতই থাকুক না কেন, আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনি একজন বিতর্কিত ব্যক্তি— যার নেতৃত্বে আরসা সংগঠনটি গঠিত হয়েছে এবং বহু হামলা পরিচালিত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন ও মিয়ানমার সরকারের অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তার সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৮ মার্চ তার গ্রেপ্তারের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বড় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। তবে এটি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

পাকিস্তানে জন্ম, সৌদি আরবে বেড়ে ওঠা

আতাউল্লাহর জন্ম পাকিস্তানের করাচিতে। ১৯৬০-এর দশকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ধর্মীয় নির্যাতনের কারণে তার পরিবার পাকিস্তানে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে তারা সৌদি আরবের মক্কায় স্থানান্তরিত হয়। আতাউল্লাহ সেখানে একটি ইসলামী বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীতে সৌদি আরবে অবস্থানরত রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে ইমাম হিসেবে কাজ করেন।

আইসিজি রিপোর্ট ও গেরিলা প্রশিক্ষণ

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজে) এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, আতাউল্লাহর সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ২০১২ সালে রাখাইন রাজ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কিছুদিন পর তিনি সৌদি আরব ত্যাগ করেন। মিয়ানমার সরকারের একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয় যে, আতাউল্লাহ পাকিস্তানে তালিবানের অধীনে ছয় মাস ধরে আধুনিক গেরিলা রণকৌশলের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। আইসিজির প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয় যে, তিনি পাকিস্তানে বা অন্য কোথাও গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলে কিছু আলামত রয়েছে। এছাড়াও, আরসার কিছু সদস্য আইসিজিকে জানিয়েছে যে, আতাউল্লাহ লিবিয়াতেও অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলে ধারণা করা হয়।

আরসার নেতৃত্ব ও সশস্ত্র কার্যক্রম

২০১৬ সালের ৯ অক্টোবরে আতাউল্লাহ শত শত বিদ্রোহীকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে নিয়ে আসেন এবং সেখানে মিয়ানমার সীমান্তের পুলিশ পোস্টে হামলা চালান। এই হামলার দায় তিনি এক সপ্তাহ পরে অনলাইনে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে স্বীকার করেন। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট তিনি আরেকটি বড় ধরনের জঙ্গি হামলার নেতৃত্ব দেন, যাতে ৭১ জন নিহত হয়।

আতাউল্লাহ আলোচিত রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে খুনের নির্দেশদাতা ছিলেন বলে আদালতের জবানবন্দিতে জানিয়েছেন এই হত্যা মামলায় গ্রেফতার চার আসামি। এছাড়া বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু সীমান্তে মাদকবিরোধী যৌথ অভিযানে ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তা (স্কোয়াাড্রন লিডার) রিজওয়ান রুশদী হত্যা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি আরসার প্রধান কমান্ডার আতাউল্লাহ।

বাংলাদেশে গ্রেপ্তার ও অভিযান

সোমবার (১৮ মার্চ) আরসা প্রধান আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনী ওরফে আতাউল্লাহসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। পৃথক দুটি অভিযানে নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহ থেকে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ২১ লাখ ৩৯ হাজার ১০০ টাকা উদ্ধার করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের আতাউল্লাহ ওরফে আবু আম্বার জুনুনী (৪৮), মোস্তাক আহাম্মদ (৬৬), সলিমুল্লাহ (২৭), ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ থানার চর আলগী এলাকার আতিকুল ইসলামের ছেলে মনিরুজ্জামান (২৪), আসমত উল্লাহ (৪০) ও মো. হাসান (৪৩), সলিমুল্লাহর স্ত্রী আসমাউল হোসনা (২৩) ও মোসাম্মত শাহিনা (২২) ।

গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে আরাকান রাজ্যের ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর ও ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীও রয়েছে। তাদের মধ্যে মনিরুজ্জামান সিদ্ধিরগঞ্জের ভূমি পল্লী এলাকায় ভাড়া থাকতেন। আর সলিমুল্লাহ, মোসাম্মত শাহিনা ও ১৭ বছর বয়সী কিশোরী কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকতেন।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm