পদ-বাণিজ্যে তোলপাড় চট্টগ্রাম নগর বিএনপি, ‘পকেট কমিটি’ নিয়ে ফুঁসছে তৃণমূল
চান্দগাঁও-পাঁচলাইশে নেতাকর্মীরা রাস্তায়
চট্টগ্রাম মহানগরে ‘টাকার বিনিময়ে অযোগ্য লোক’ নিয়ে বিভিন্ন ওয়ার্ডে বিএনপির ‘পকেট কমিটি’ বাতিলের দাবিতে পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। গত ৩ জুন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আওতাধীন ৩৫টি ওয়ার্ডে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন ও অনুমোদন দেয় দলটির নগর শাখা। এসব কমিটি অনুমোদন করেন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ ও সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান। এর মধ্যে এরশাদ উল্লাহকে নিয়ে দলের ভেতরে শুরু থেকেই তৃণমূল নেতাকর্মীদের ক্ষোভ রয়েছে। তাদের মতে, এরশাদ উল্লাহর কোনো সাংগঠনিক দক্ষতা নেই।

দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের এসব ওয়ার্ড কমিটি গঠনের পর থেকেই অসন্তোষ ও বিক্ষোভ দেখিয়ে আসছেন। তারা বলছেন, চট্টগ্রাম নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে ৩১ সদস্যবিশিষ্ট যেসব কমিটি করা হয়েছে, সেসবে ত্যাগী ও যোগ্য নেতৃত্বের পরিবর্তে নিষ্ক্রিয় ও অসাংগঠনিক লোকেরা স্থান পেয়েছেন। দলের দুঃসময়ে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। দলের নেতাকর্মীরা তাদের চেনেও না। অযোগ্য নেতারা ‘টাকার বিনিময়ে অযোগ্য লোক’ নিয়ে এসব কমিটি পয়দা করেছেন।

এর আগে গত বছরের ৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম মহানগরীর সাংগঠনিক ১৫টি থানা ও ৪৩টি ওয়ার্ড কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় বিলুপ্ত ঘোষণা করেছিল মহানগর বিএনপি।
কমিটি বাতিলের দাবিতে চান্দগাঁওয়ে বিক্ষোভ মিছিল
চট্টগ্রাম নগরীর অন্য ওয়ার্ডের মতো চান্দগাঁও থানাধীন বিভিন্ন ওয়ার্ডেও ত্যাগী, কারা নির্যাতিত ও যোগ্য নেতাদের বাদ দিয়ে ব্যক্তিবিশেষের খেয়ালখুশি মতো অযোগ্য, নিষ্ক্রিয় ও অসাংগঠনিক ব্যক্তিদের দিয়ে পকেট কমিটি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই কমিটি বাতিলের দাবিতে বৃহস্পতিবার (১২ জুন) ৪ নম্বর চান্দগাঁও, ৫ নম্বর মোহরা ও ৬ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ড বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলটি নগরীর বহদ্দারহাট মোড় থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পদক্ষিণ করে চান্দগাঁও পাঠানিয়া গোদা এলাকায় গিয়ে শেষ হয়।
মিছিল পূর্ববর্তী এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশ চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি নাজিম উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি সাবেক কাউন্সিলর মাহবুবুল আলম।
বিএনপি নেতা মাহবুবুল আলম বলেন, দীর্ঘদিন পর চান্দগাঁও থানার আওতাধীন ৪ নম্বর চান্দগাঁও, ৫ নম্বর মোহরা, ৬ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ও ৪৫ নম্বর চান্দগাঁও ওয়ার্ড বিএনপির নতুন কমিটি গঠন করা হয়। ঘোষিত এই কমিটি দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতৃত্বকে চরমভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। বিগত ১৬ বছর আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম যারা রাজপথে ভূমিকা রেখেছেন, হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, কারাভোগ করেছেন, তাদের ওয়ার্ড কমিটিতে মূল্যায়ন করা হয়নি। ত্যাগী ও যোগ্য নেতৃত্বের পরিবর্তে নিষ্ক্রিয় ও অসাংগঠনিক লোকেরা কমিটিতে স্থান পেয়েছে। দলের দুঃসময়ে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। দলের নেতাকর্মীরা তাদের চেনেও না। চান্দগাঁও থানা বিএনপির নেতাকর্মীদের মতামতকে অগ্রাহ্য করে ব্যক্তি বিশেষের খেয়ালখুশি মতো ওয়ার্ড কমিটিগুলো গঠন করা হয়েছে। আমরা অবিলম্বে এইসব ওয়ার্ড কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি গঠনের জোর দাবি জানাই।
সভাপতির বক্তব্যে মহানগর বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি নাজিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিএনপির নেতৃবৃন্দের সাথে কোন প্রকার আলাপ-আলোচনা ছাড়াই ৪ নম্বর চান্দগাঁও ওয়ার্ডকে বিভক্ত করে ৪ নম্বর চান্দগাঁও ওয়ার্ড ও ৪৫নং সাংগঠনিক ওয়ার্ড নামে দুটি আলাদা কমিটি করা হয়েছে যা একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত। তৃণমূলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা এইসব পকেট কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছে। আগামী দিনে ভোটের মাঠ ও রাজপথ অনুকূলে রাখতে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বই তৃণমূলের নেতাকর্মীরা প্রত্যাশা করে। বিএনপিকে শক্তিশালী করতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে পরীক্ষিত, যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করে ওয়ার্ড কমিটিগুলো পুনর্গঠনের জন্য আমরা দলের হাইকমান্ডে প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
চান্দগাঁও থানা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন ভুইয়ার সঞ্চালনায় এতে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মঞ্জুর আলম মঞ্জু, সাবেক মৎস্য বিষয়ক সম্পাদক মো. বকতেয়ার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক নকীব উদ্দিন ভুইয়া, সদস্য মঞ্জুর আলম মঞ্জু, জসিম উদ্দিন, পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ইলিয়াস শেকু, পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম মুন্সী, মোহাম্মদ আইয়ুব, ম. হামিদ, মো. আলী সাকি, গোলজার হোসেন, ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াছ আলী, সিনিয়র সহ-সভাপতি আবু বক্কর, মোহরা ওয়ার্ড বিএনপি নেতা দানু সওদাগর, নুরুল আলম লিটন, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক এম আবু বক্কর রাজু, যুবদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক সেলিম উদ্দিন রাসেল প্রমুখ।
পাঁচলাইশে বিক্ষোভ
এর আগে গত সোমবার (৯ জুন) বিকেলে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আওতাধীন পাঁচলাইশ ৩ নং ওয়ার্ড বিএনপির আহবায়ক কমিটিতে ত্যাগী, কারানির্যাতিত ও যোগ্য নেতাদের বাদ দিয়ে স্বজনপ্রীতির কমিটি করার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করে পাঁচলাইশ ওয়ার্ড বিএনপির বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। নগরীর অক্সিজেন কুয়াইশ সংযোগ সড়কের নয়াহাট এলাকায় এই বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
মিছিলটি নয়াহাট থেকে শুরু হয়ে বকসু নগর, কয়লার ঘর হয়ে অক্সিজেন মোড়ে গিয়ে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সমাবেশ থেকে নেতৃবৃন্দ এই পকেট কমিটি দ্রুত বাতিল করে নতুন কমিটি ঘোষণার দাবি জানান।
পাঁচলাইশ ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি মোহাম্মদ ইসমাঈল বালির সভাপতিত্বে ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক এসএম আবুল কালাম আবুর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সহ সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সহ সাধারণ সম্পাদক জিএম আইয়ুব খান ও সাবেক সদস্য আবদুর রহিম।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, পাঁচলাইশ ওয়ার্ড বিএনপির যে কমিটি গঠন করা হয়েছে তা নেতাদের পকেট কমিটি। যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে পছন্দের লোক দিয়ে কমিটি করা হয়েছে। যারা আওয়ামী স্বৈরাচার সরকারের আমলে নির্যাতিত হয়েছে তাদেরকে বাদ দিয়ে যারা নেতাদের কথামত চলবে তাদেরকেই এই পকেট কমিটিতে রাখা হয়েছে। নবগঠিত কমিটিতে বিগত সময়ে কারানির্যাতনের শিকার হওয়া নেতাদের বাদ দিয়ে পরিবারতন্ত্র কায়েম করে পকেট কমিটি করা হয়েছে। বহু যোগ্য নেতা থাকতেও একজন নিস্ক্রিয় ব্যক্তিকে আহবায়ক করেছে। আন্দোলন সংগ্রামে তার কোনো ভূমিকা ছিল না৷ যাকে সদস্য সচিব করেছে তার সাথে আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছিরের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
শুধুমাত্র একটি পরিবারকে খুশি করতেই যোগ্যদের বাদ দিয়ে সুবিধামতো লোক দিয়ে পকেট কমিটি করা হয়েছে— এমন দাবি করে বক্তারা ঘোষিত আহবায়ক কমিটি বাতিল করে তৃণমূলের ত্যাগী নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করে নতুন কমিটি ঘোষণার দাবি জানান।
সভায় উপস্থিত ছিলেন বায়েজিদ থানা বিএনপির সাবেক সহ সভাপতি মোরশেদুল আলম, মফজল আহমেদ কোম্পানি, যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল ইসলাম সওদাগর, মো. ইউসুফ, আবুল বশর, মো. আলম, মো. আলমগীর, মো. আশরাফ, নুরু সওদাগর, পাঁচলাইশ ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, যুগ্ম সম্পাদক ওসমান গণি, সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল হালিম কালু, প্রচার সম্পাদক মো. চান মিয়া, অর্থ সম্পাদক বেলাল সরদার, থানা বিএনপির সাবেক সহ সাংগঠনিক সম্পাদক আজম নাজের, যুব বিষয়ক সম্পাদক মো. ইলিয়াছ, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আব্দুস ছবুর, তাঁতী বিষয়ক সম্পাদক মো. ইলিয়াস, ওয়ার্ড বিএনপির সহ সভাপতি বাদশা মিয়া, যুগ্ম সম্পাদক মো. ফারুক, মাহবুব আলম কাজল, বিএনপি নেতা মো. মুছা, মহিউদ্দিন জুয়েল, আবু বক্কর, নাজিম উদ্দীন নাজু, আনোয়ার হোসেন, আইয়ুব খান, মো. নাছির, আবু তাহের, আনোয়ার হোসেন সুজন প্রমুখ।
সিপি