চট্টগ্রামের নারী বিশ্ববিদ্যালয়ে গাজার মেয়েদের পড়তে দেবে না ফিলিস্তিন, বিতর্কে ইসরায়েল-কানেকশন
অভিযোগ অস্বীকার কর্তৃপক্ষের
চট্টগ্রামভিত্তিক এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে (এইউডব্লিউ) সঙ্গে ইসরায়েলঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সম্পর্ক থাকার অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশের ফিলিস্তিন দূতাবাস। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ফিলিস্তিনি ছাত্রী পড়াশোনা করুক সেটা তারা চায় না। এ কারণে ভর্তি হওয়ার অপেক্ষায় থাকা ফিলিস্তিনের অধিকৃত গাজা উপত্যকার ১৭১ ছাত্রীর বাংলাদেশে অন অ্যারাইভালও ভিসা আটকে দেওয়া হয় ফিলিস্তিন দূতাবাসের আপত্তিতে। গত জুনে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের (সিএমপি) পক্ষ থেকে ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনকে জানিয়ে দেওয়া হয়। দূতাবাসের দাবি, বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক নয়, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নেও গুরুতর। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছে, তারা কোনো ইসরায়েলি তহবিল গ্রহণ করেনি এবং পুরো উদ্যোগটি ছিল মানবিক। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে বিভিন্ন দেশের এক হাজার ৬২৯ জন ছাত্রী ভর্তি রয়েছে, যার অর্ধেকই বাংলাদেশি।

ভিসা ছিল, হঠাৎ বাতিল
প্রায় দেড় বছর আগে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার প্রায় ২০০ ছাত্রীকে বৃত্তি দেয় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন কর্তৃপক্ষ। গত বছরের অক্টোবরে ১৮৯ জনকে ভিসা অন অ্যারাইভালের অনুমতি দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। চলতি বছরের জুনে ছাত্রীদের চট্টগ্রামে আসার কথা থাকলেও নগর পুলিশের (সিএমপি) পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে জানানো হয়, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ওই ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৭১ জন ফিলিস্তিনি ছাত্রীর জন্য নতুন করে ভিসার আবেদন করে।

বিশেষ ফ্লাইটও থামল কেন
গত জুলাইয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, ইউনিসেফের তত্ত্বাবধানে ফিলিস্তিনের গাজা থেকে ছাত্রীদের জর্ডানের আম্মানের কুইন আলিয়া ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে এনে সেখান থেকে এমিরেটসের বিশেষ ফ্লাইটে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে। কিন্তু এর মধ্যেই ঢাকায় ফিলিস্তিন দূতাবাস লিখিত আপত্তি তোলে যে, তারা এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে ছাত্রী পাঠাতে চায় না। বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশের অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার প্রস্তাব দেয় দূতাবাস।

রাষ্ট্রদূতের অবস্থান: ‘মানবিকতার যুক্তি ফাঁপা’
১৪ আগস্ট এক বিবৃতিতে রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস ওয়াই রামাদান জানান, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের সঙ্গে ইসরায়েল-সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান ও নীতিগত অবস্থানের যোগসূত্র নিয়ে গভীর উদ্বেগ থেকেই তাদের সিদ্ধান্ত। তার ভাষায়, পাঁচটি সরকার—যাদের কেউ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং যারা ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ করে চলেছে, তারা ফিলিস্তিন দূতাবাসকে ‘মানবিক কারণে’ এশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষার্থী ভর্তি অনুমোদন দিতে চাপ দিয়েছে। তাদের মানবিকতার যুক্তি ফাঁপা। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নাম উল্লেখ করলেও কূটনৈতিক কারণে বাকি তিনটি দেশের নাম প্রকাশ করেননি।

দূতাবাস জানায়, বাংলাদেশের ২০টিরও বেশি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০টির বেশি পূর্ণ বৃত্তি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং সরকার সহযোগিতায় প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর জন্য ভিসা-অন-অ্যারাইভাল সুবিধাও নিশ্চিত হয়েছে।

চেরি ব্লেয়ার, কোগাট ও ইসরায়েলি সংযোগ: কেন বন্ধ ফিলিস্তিনি ভর্তি
দূতাবাস বলছে, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে ফিলিস্তিনি ছাত্রী না পাঠানোর সিদ্ধান্তটি নিরাপত্তা ঝুঁকি ও নৈতিক আপত্তির সমন্বিত ফল। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো, তহবিলের উৎস ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের প্রশ্ন রয়েছে।
ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত যে উদাহরণগুলো তুলে ধরেন:
চেরি ব্লেয়ারের চ্যান্সেলর পদ: বাংলাদেশে একমাত্র বিদেশি চ্যান্সেলর চেরি ব্লেয়ার সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের স্ত্রী, যিনি গাজার ‘রিভিয়েরা’ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত এক প্রভাবশালী ব্যক্তির স্ত্রী হিসেবে সমালোচিত। ওই প্রকল্প গাজা ‘পুনর্গঠনের’ নামে ব্যাপক উচ্ছেদ ঘটাতে পারে, যা অনেকে জাতিগত নির্মূলের নকশা হিসেবে দেখেন।
বোর্ড ও দাতাদের ইসরায়েল-সংযোগ: বোর্ড অব ট্রাস্টিজের কয়েক সদস্য ও প্রধান দাতা (বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, বায়ার এজি, ডাইরেক্ট রিলিফ) ইসরায়েলি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা অধিকৃত ভূখণ্ডে কার্যরত কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ। এশিয়ান ইউনিভার্সিটির নতুন ক্যাম্পাসের স্থপতি মোশে সাফদিই ইসরায়েলি।
কোগাটের সঙ্গে অংশীদারিত্ব: ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের শাখা কোগাটের সঙ্গে সহযোগিতা ‘গভীরভাবে উদ্বেগজনক’, কারণ কোগাট ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ ঘটানো নীতিতে জড়িত।
পশ্চিমা চাপ: যুক্তরাষ্ট্রসহ পাঁচটি পশ্চিমা দেশ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে শিক্ষার্থী পাঠাতে চাপ দিয়েছে বলে অভিযোগ।
অর্থায়ন ইস্যু: এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি কাতারের কাছে ২০০ ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীর জন্য ১৫ মিলিয়ন ডলারের অনুদান চেয়েছেন বলে দূতাবাস জানায়। দূতাবাসের অবস্থান, ইসরায়েল-সংযুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ গ্রহণ গ্রহণযোগ্য নয়।
‘ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীরা পণ্য নয়’
কিছু গণমাধ্যমে আসা ‘আবেদন প্রক্রিয়ায় বিলম্বে ৩০ ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীর মৃত্যু’ দাবি রাষ্ট্রদূত প্রত্যাখ্যান করেন। তার বক্তব্য, ওই শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছায় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন থেকে সরে গিয়ে দূতাবাসের উদ্যোগে বিকল্প প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছেন। অতীতে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে একজন আফগান ও একজন লাও শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও ব্যাখ্যা মেলেনি, যা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
তিনি জানান, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে অধ্যয়নরত সব নারী শিক্ষার্থী অন্য কোনো নিরাপদ ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে ইচ্ছুক। দূতাবাস আনুষ্ঠানিকভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশে পড়াশোনায় তাদের কোনো আপত্তি নেই, শর্ত শুধু একটাই—এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে কোনোভাবেই নয়। রাষ্ট্রদূতের স্পষ্ট ঘোষণা, ‘ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীরা পণ্য নয়। তারা বিক্রির জন্য নয়। আমাদের জনগোষ্ঠীর জাতিগত নির্মূলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরা আপস করব না’।
বর্তমানে ৭০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে পড়ছেন এবং আরও শিক্ষার্থীকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে আনার কাজ চলছে বলে রাষ্ট্রদূত জানান।
সম্প্রতি ৪১ জন শিক্ষার্থী বাংলাদেশের শিক্ষাজীবন শেষ করে গাজার দিকে ফিরে গেছে। তাদের মধ্যে অনেকেই এমবিবিএস স্নাতক এবং গাজার হাসপাতাল ও চিকিৎসাশিবিরে কর্মরত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জবাব: ‘ইসরায়েলি তহবিল নয়, পুরোপুরি মানবিক’
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দূতাবাসের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০০৬ সালের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন অ্যাক্ট অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিচালিত হয়, যেখানে আচার্যের জাতীয়তা বা তহবিল উৎসে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তাদের পরিচালনা পর্ষদ চেরি ব্লেয়ারকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে তার সুনাম ও নারী শিক্ষায় অবদানের কারণে আচার্য নির্বাচিত করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি, তারা কখনও কোনো ইসরায়েলি সংস্থা থেকে তহবিল নেয়নি কিংবা কোনো অংশীদারিত্বে জড়ায়নি। ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের গাজা থেকে সরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানের সহযোগিতায় কাজ করা হয়েছে, যা ছিল সম্পূর্ণ মানবিক উদ্যোগ। এই মিশনের প্রতি ফিলিস্তিনের জাতিসংঘের রাষ্ট্রদূত রিয়াদ মনসুর প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন এবং বাংলাদেশি জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় আরও জানায়, ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো বহিরাগত অর্থায়ন পাওয়া যায়নি, বরং নিজেদের তহবিল থেকে ডরমিটরি, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, রাষ্ট্রদূতের বিরোধিতা সত্ত্বেও গাজার শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনই উদ্ধারের জন্য তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
১৭ বছরের পথচলা
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন (এইউডব্লিউ) চট্টগ্রামে অবস্থিত একটি স্বাধীন ও আবাসিক আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। চট্টগ্রামের দামপাড়া মোহাম্মদ আলী রোডে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ লিংক রোডের আরেফিন নগরে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজও প্রায় শেষের পথে। ২০০৮ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, কম্বোডিয়ার ১৩০ জন ছাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়টি। বর্তমানে এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ ১৯টি দেশ থেকে এক হাজার ৬২৯ জন ছাত্রী ভর্তি রয়েছে, যার অর্ধেকই বাংলাদেশি। এছাড়া রয়েছেন আফগানিস্তান, ভুটান, কম্বোডিয়া, কানাডা, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, সিরিয়া, ভিয়েতনাম ও ফিলিস্তিনসহ আরও কয়েকটি দেশের ছাত্রীরা। বিশ্ববিদ্যালয়টি পুরোটাই অনুদানের ওপর ওপর নির্ভরশীল। ৯৯ ভাগ শিক্ষার্থীই এখানে বৃত্তি পান।
বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান চ্যান্সেলর চেরি ব্লেয়ার, যিনি যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের স্ত্রী। ২০২২ সাল থেকে এর ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে রয়েছেন পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এর সাবেক সভাপতি রুবানা হক।
গাজার মেয়েদের ভবিষ্যত কে ঠিক করবে?
চলমান বিষয়গুলোর ওপর নজর রাখছেন— এমন একটি সূত্র চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ফিলিস্তিনি ছাত্রীদের নিয়ে চলমান অচলাবস্থায় মূল প্রশ্ন দুটি রয়ে গেছে। প্রথমত, গাজার শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশে আনার পথটি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন বাদ দিয়ে কিভাবে দ্রুত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। দ্বিতীয়ত, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন ও দূতাবাসের পরস্পরবিরোধী অবস্থান থেকে উদ্ভূত নৈতিক-রাজনৈতিক বিতর্কের সমাধান কিভাবে হবে। কারণ একদিকে দূতাবাস বিকল্প বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর জোর দিচ্ছে, অন্যদিকে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন তাদের মানবিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখার কথা বলছে।
সিপি