দেশের সবচেয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিপিসিএল) পরিচালিত এ কেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা বকেয়া পড়ে রয়েছে। শীঘ্রই বকেয়া পরিশোধ করা না হলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
কয়লা সংকটে হুমকিতে উৎপাদন
পটুয়াখালীর পায়রায় অবস্থিত এই ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ২০২০ সাল থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আসছে। উৎপাদনের একমাত্র কাঁচামাল—বিদেশ থেকে আমদানি করা কয়লা। চলতি বছরের শুরু থেকে উৎপাদন ধারাবাহিক থাকায় কয়লার আমদানিও বেড়েছে। কিন্তু অর্থ পরিশোধে গড়িমসির কারণে কয়লা সরবরাহ, খালাস ও পরিবহনের পুরো প্রক্রিয়াটিই এখন প্রায় স্থবির।
বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে কয়লা সরবরাহ ব্যবস্থা
বর্তমানে প্রতিটি ‘মাদার ভেসেল’ থেকে কয়লা খালাসে গড়ে ২৪-২৫টি ‘লাইটার জাহাজ’ প্রয়োজন হয়। দুইটি মাদার ভেসেলের জন্য দরকার পড়ে প্রায় ৫০-৫৫টি লাইটার ট্রিপ। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিশাল অঙ্কের খরচ। কয়লার আমদানি মূল্য, জাহাজ পরিবহন খরচ (ওশান ফ্রেইট) এবং খালাস ও লাইটারিং ব্যয় ছাড়া ডেমারেজ চার্জ হিসেবে প্রতিদিন ১২-১৫ হাজার মার্কিন ডলার খরচ হয়ে থাকে।
এ ছাড়া ঠিকাদারদের রয়েছে জ্বালানি, জাহাজ ভাড়া ও অন্যান্য অপারেটিং কস্ট। জানা গেছে, যথাসময়ে অর্থ না পাওয়ায় কয়লা সরবরাহকারীরা জাহাজ পাঠানো বন্ধ করার হুমকি দিচ্ছে। ফলে কয়লা আমদানি, খালাস এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছানোর পুরো প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে।
পায়রার একাধিক জাহাজ বন্দরে অপেক্ষমাণ
বর্তমানে চট্টগ্রাম বহিনোঙরে একটি জাহাজ থেকে কয়লা খালাস চললেও আরও তিনটি জাহাজ অপেক্ষায়। আগামী কয়েকদিনে যুক্ত হবে আরও কয়েকটি। পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় এই কয়লা খালাসও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। প্রতিটি মাদার ভেসেল থেকে কয়লা লাইটারিং করতে গড়ে ২৪-২৫টি লাইটার জাহাজের প্রয়োজন হয়। একসঙ্গে দুটি জাহাজ খালাস করলে ৫০টিরও বেশি লাইটার ট্রিপ লাগে। সময়মতো খালাস না হলে প্রতিদিন ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত ডেমারেজ চার্জ গুনতে হয়, যা বিপিডিবির ওপর বর্তায়।
আগের অভিজ্ঞতাও বিপজ্জনক ইঙ্গিত
এর আগেও কয়লা সরবরাহকারী চীনের কোম্পানি ‘সিএমসি’ কয়েক দফায় বকেয়া পরিশোধ না করায় সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। ফলে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর প্রভাবে বরিশাল, খুলনা, যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে মারাত্মক বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়।
‘যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে উৎপাদন’
বিসিপিসিএলের একজন কর্মকর্তা জানান, ‘৬ হাজার কোটি টাকা পাওনা পড়ে আছে সরকারের কাছে। কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হলে পায়রার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। এতে প্রচণ্ড গরমে ভয়াবহ লোডশেডিং শুরু হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগে চিঠি দিয়ে আমরা সতর্ক করেছি যে, ত্বরিত অর্থ ছাড় না হলে কেন্দ্রের উৎপাদন স্থগিত করা ছাড়া বিকল্প থাকবে না।’
জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় পায়রার গুরুত্ব
বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা ১৫৩টি, যাদের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ২৪ হাজার ১৪৩ মেগাওয়াট। তবে বাস্তবে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদাই মেটানো সম্ভব হচ্ছে। এর মধ্যে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো ১১ শতাংশ হলেও মোট ৭ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে এ খাত থেকে। এর বড় অংশই নির্ভর করে পায়রার উপর।
জরুরি ব্যবস্থা না নিলে বিদ্যুৎ বিপর্যয় অনিবার্য
যদি দ্রুত অর্থ ছাড় না করা হয়, তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়বে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে এবং ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের মুখে পড়বে দেশ। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ পড়বে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পায়রা কেন্দ্র দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। অনাকাঙ্ক্ষিত বিপর্যয় এড়াতে অবিলম্বে বিপিডিবিকে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
সিপি