নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ ছাড়া রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। তাদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা, সমাজের মনস্তাত্তিক পরিবর্তন এবং সর্বস্তরের ঐক্য জরুরি।
শনিবার (২৬ জুলাই) সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এক সংলাপে তারা এসব কথা বলেন। ‘গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে: রাজনৈতিক পরিসরে নারী এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এই মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামের থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে।
এটি ছিল ‘রাজনীতিতে নারী ও যুবাদের ক্ষমতায়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের অংশ, যা বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সহায়তায় বাস্তবায়ন করছে সিজিএস।
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সিজিএস’র সভাপতি জিল্লুর রহমান। আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেন, সাবেক এমপি ও মহানগর জামায়াতের সাবেক আমির শাহজাহান চৌধুরী, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপমন্ত্রী মনি স্বপন দেওয়ান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রধান সমন্বয়কারী জুবাইরুল হাসান আরিফ, সিপিবি চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি অশোক সাহা এবং গণসংহতি আন্দোলন চট্টগ্রামের সমন্বয়কারী হাসান মারুফ রুমি।
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সব রাজনৈতিক শক্তির ঐক্য জরুরি। বিএনপির ভেতরে এখন অনেক নারী পরিচিতি গড়ে তুলেছেন। আমরা চাই তারা পূর্ণ নেতৃত্বে আসুন।’ তিনি দলীয়ভাবে তরুণ ও প্রান্তিক কর্মীদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথাও উল্লেখ করেন।
শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘দেশের সব বড় আন্দোলনে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, কিন্তু মূলধারার রাজনীতিতে তাদের জায়গা হয়নি। জামায়াত তরুণদের অগ্রাধিকার দিয়ে ৩০টির বেশি আসনে মনোনয়ন দিচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ওয়ার্ডে নারীনেত্রীদেরও নেতৃত্বে আনা হচ্ছে।’
সিপিবির অশোক সাহা বলেন, ‘জুলাইয়ের আন্দোলন ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। এবার তরুণরা যেভাবে সক্রিয় হয়েছে, তা নজিরবিহীন। কিন্তু সাইবার হয়রানি, নারীবিদ্বেষ ও জাতিগত বিদ্বেষ রয়ে গেলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।’
মনি স্বপন দেওয়ান বলেন, ‘নারী ও তরুণরা আন্দোলনে ছিল সামনে, এখন নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হবে—আমরা কি কিছু পরিবর্তন আনতে পেরেছি?’ তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির আহ্বান জানান।
হাসান মারুফ রুমি বলেন, ‘আন্দোলনের সময় সাহসী নারী যারা ভাইদের গ্রেপ্তার থেকে রক্ষা করেছেন, তারা এখন কেন অনলাইনে হয়রানির শিকার? গত ১৫ বছর নারীদের জন্য রাজনীতি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। এখনো পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলায়নি। নারীশক্তিকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আনতে হবে।’
এনসিপি নেতা জুবাইরুল হাসান আরিফ জানান, তাদের দল ১০০টি সংসদীয় আসনে শুধুমাত্র নারীদের জন্য সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছে। আমরা চাই রাজনীতিতে নারীর উপস্থিতি কোটার মাধ্যমে নয়, নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবেই হোক। কিন্তু মূলধারার দলগুলো এখনো আন্দোলনের পরবর্তী সমাজ বাস্তবতাকে বোঝেনি।
সংলাপে উপস্থিত প্রায় ২০০ তরুণ, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পেশার মানুষ সরাসরি প্রশ্ন করেন নেতাদের উদ্দেশ্যে। তারা বলেন—সংরক্ষিত আসন কি প্রকৃত অংশগ্রহণের বিকল্প? এআই প্রযুক্তির ঝুঁকিতে নারীর অবস্থান কী? আন্দোলনের সময় নারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছিলেন, এখন কেন তাদের আহ্বান করতে হয়? ৫ আগস্টের পর নারী সহিংসতা কেন বেড়েছে?
এই সংলাপটি ছিল তরুণ নাগরিকদের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্ল্যাটফর্ম, যার উদ্দেশ্য ছিল জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের সঙ্গে তরুণদের মুক্ত আলোচনা, অংশগ্রহণমূলক শাসন, স্বচ্ছতা এবং প্রজন্মগত বোঝাপড়াকে উৎসাহ দেওয়া।
জেজে/ডিজে