বন্দরে ‘জাল চিঠি’ বানিয়ে ৫০ কোটি টাকা ফাঁকির চেষ্টায় ধরা বসুন্ধরা!

বিমানে পালানোর সময় দুই জালিয়াত আটক

চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় ৫০ কোটি টাকার স্টোর রেন্ট ফাঁকি দিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের জাল চিঠি বানিয়ে জমা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত ওই জালিয়াতি ভেস্তে যায়। উদ্দেশ্য ছিল বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া। ধরা পড়ে মূল জালিয়াত—যাকে পুলিশে সোপর্দও করা হয়েছে। আর এরই মধ্যে এ ঘটনায় দায়ের হয়েছে প্রতারণা ও জালিয়াতির মামলা।

বন্দরে ‘জাল চিঠি’ বানিয়ে ৫০ কোটি টাকা ফাঁকির চেষ্টায় ধরা বসুন্ধরা! 1

ঢাকায় প্রধান কার্যালয় হলেও বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজের প্রকল্প কার্যালয় চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের শিল্পনগরের ১৫ নম্বর জোনে।

জাল চিঠিতে মওকুফের ‘সরকারি সম্মতি’

বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ গত ১২ মে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর একটি আবেদন জমা দেয়, যেখানে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব নজরুল ইসলামের নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে দাবি করা হয়—‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২-এর ২২ ও ২৩ ধারার আওতায়, প্রতিষ্ঠানের আমদানিকৃত মালামালের ষাট শতাংশ পণ্য এক মাসের মধ্যে খালাস করার শর্তে স্টোর রেন্ট মওকুফে সরকারের সম্মতি রয়েছে।’

ভাষা দেখে বাড়ে বন্দরের সন্দেহ

বন্দরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পত্রটির ভাষা ও উপস্থাপন দেখে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং এর সত্যতা যাচাইয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মন্ত্রণালয় থেকে ১৪ মে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক পত্রে জানানো হয়, ‘এ বিষয়ে এ মন্ত্রণালয় থেকে কোনো চিঠি ইস্যু করা হয়নি। উক্ত পত্রের ভাষ্য অসংগতিপূর্ণ এবং স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে।’

আগের আবেদনের নেপথ্যে

জানা গেছে, বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ গত বছরের ১২ জুন থেকে চলতি বছরের ২ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ের মধ্যে চারটি পৃথক জাহাজের মাধ্যমে ৯৫টি ৪০ ফুট এবং ১৪টি ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের এফসিএল (ফুল কনটেইনার লোড) কনটেইনারের মাধ্যমে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করে। এসব কনটেইনার যথাসময়ে খালাস না করায় বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে বিপুল অঙ্কের স্টোর রেন্ট বকেয়া পড়ে।

জানা গেছে, বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল এর আগে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) এক পত্রের বরাত দিয়ে বন্দরের ওপর স্টোর রেন্ট মওকুফ চেয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে। এর প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় গত ৫ জানুয়ারি, ২০২৫ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মতামত চায়। বন্দর কর্তৃপক্ষ ১৯ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়কে জানায় যে, প্রতিষ্ঠানটির দায়েরযোগ্য স্টোর রেন্টের পরিমাণ প্রায় ৭২ কোটি টাকা এবং এটি আদায়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানায়।

উদ্দেশ্য ছিল ৫০ কোটি টাকা ফাঁকি

বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসেবে, শুধুমাত্র এই জাল পত্রের মাধ্যমে বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল প্রায় ৫০ কোটি টাকার স্টোর রেন্ট ফাঁকি দেয়ার অপচেষ্টা করেছিল। প্রতিষ্ঠানটির এমন অপতৎপরতা বন্দর কর্তৃপক্ষকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে।

জালিয়াতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরপরই চট্টগ্রাম বন্দর থানায় প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। মূল অভিযুক্তকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকেও একটি চিঠির মাধ্যমে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে—এই ভুয়া পত্রের ভিত্তিতে কোনো কার্যক্রম গ্রহণ না করার জন্য।

বুধবার (১৪ মে) চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নজরুল ইসলাম আজাদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ কর্তৃক আবেদনকৃত ষ্টোররেন্ট মওকুফ সংক্রান্ত একটি ভূয়া/জাল পত্র পাওয়া গেছে। পত্রটির ভাষ্য অসংগতিপূর্ণ এবং জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে কোনো পত্র ইস্যু করা হয়নি। অতএব, উক্ত পত্র অনুযায়ী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’

বিমানে পালানোর চেষ্টা

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের তৎপরতা আঁচ করতে পেরে জালিয়াতির মূল হোতা বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মোহাম্মদ ফয়েজ তার এক সহযোগীসহ বৃহস্পতিবার (১৫ মে) বিকেলে বিমানে তড়িঘড়ি ঢাকা চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

কিন্তু এরই মধ্যে বন্দর থানার পুলিশের বড় একটি টিম চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে যায়। ততোক্ষণে ফয়েজ ও তার সহযোগী কর্মকর্তা বোর্ডিং পাস নিয়ে বিমানে ওঠার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু তার আগেই বিকেল ৫টার দিকে পুলিশ দুজনকেই বিমানবন্দরের ভেতর থেকে ধরে নিয়ে আসে।

কালো তালিকায় ঢোকানোর চিন্তা

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রতারকচক্রের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। এ ঘটনায় তারা আরও সতর্ক হয়েছে এবং জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের জালিয়াতি ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম থেকে স্থায়ীভাবে কালো তালিকাভুক্ত করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm