বিপ্লব বড়ুয়ার ‘সুবিধাভোগী’ নেতারা এলডিপিতে, আওয়ামী লীগের তৃণমূলে হৈচৈ

ইটভাটা মালিক ঠাঁই পেয়েছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটিতে

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় আওয়ামী লীগের অন্তত পাঁচজন নেতা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিতে (এলডিপি) যোগ দিয়েছেন। এদের সকলেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়ার অনুসারী। দলত্যাগী নেতাদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ধর্মবিষয়ক উপকমিটির সদস্য মো. শামসুল ইসলামও। এই ইটভাটা মালিক বিপ্লব বড়ুয়ার আনুকূল্য পেয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পান।

এলডিপিতে যাওয়া আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মনির আহমদ বিপ্লব বড়ুয়া ও তার পিএস আরিফের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। গণভবনেও ছিল তার অবাধ যাতায়াত।
এলডিপিতে যাওয়া আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মনির আহমদ বিপ্লব বড়ুয়া ও তার পিএস আরিফের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। গণভবনেও ছিল তার অবাধ যাতায়াত।

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যূত হওয়ার পর বিপ্লব বড়ুয়া প্রথমে ভারতে চলে যান। পরে তিনি সেখান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। বর্তমানে তিনি টেক্সাসে তার নিজের বাড়িতে অবস্থান করছেন বলে একটি সূত্রে জানা গেছে।

সাতকানিয়ার ইটভাটা মালিক শামসুল ইসলাম আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ধর্ম বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হওয়ার জন্য শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়ার প্রতি ‘বিশেষ কৃতজ্ঞতা’ প্রকাশ করেছিলেন।
সাতকানিয়ার ইটভাটা মালিক শামসুল ইসলাম আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ধর্ম বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হওয়ার জন্য শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়ার প্রতি ‘বিশেষ কৃতজ্ঞতা’ প্রকাশ করেছিলেন।

গণভবনের অতিথি থেকে অলির সৈনিক

বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা শামসুল ইসলাম এলডিপিতে যোগ দেন। এরপর শনিবার (২১ জুন) প্রাথমিক সদস্যপদ পূরণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিপিতে যোগ দেন উত্তর সাতকানিয়া সাংগঠনিক থানা আওয়ামী যুবলীগের সহ-সভাপতি ও কেঁওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মনির আহমদ, কেঁওচিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি সদস্য আবু তালেব সিকদার, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউপি সদস্য সাহেব মিয়া এবং উত্তর সাতকানিয়া আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও সংরক্ষিত আসনের ইউপি সদস্য রোকেয়া বেগম। তাদের সকলে চট্টগ্রাম নগরে এলডিপি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সভাপতি মো. এয়াকুব আলীর ব্যবসায়িক কার্যালয়ে গিয়ে প্রাথমিক সদস্যপদের ফরম জমা দেন।

গত ২ মার্চ চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার চট্টেশ্বরী এলাকা থেকে ইটভাটা মালিক ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ধর্ম বিষয়ক উপকমিটির সদস্য শামসুল ইসলাম পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। পরে তিনি জামিনে বেরিয়ে আসেন। ৪৫ বছর বয়সী শামসুল ইসলামের বাড়ি সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডে। ২০২৪ সালের মার্চে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ধর্ম বিষয়ক উপকমিটির সদস্য মনোনীত হন। এজন্য তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়ার প্রতি ‘বিশেষ কৃতজ্ঞতা’ প্রকাশ করেছিলেন।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নেতাদের অভিযোগ, শামসুল ইসলাম গত বছরের ৪ আগস্ট সাতকানিয়ার কেরানীহাট হক টাওয়ার সামনে সাধারণ ছাত্র জনতার ওপর হামলাকারী যুবলীগ-ছাত্রলীগের অর্থ যোগানদাতা ছিলেন।

এলডিপিতে যাওয়া আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মনির আহমদও শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়ার পিএস আরিফের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। সেই সূত্র ধরে পরে হৃদ্যতা গড়ে ওঠে বিপ্লব বড়ুয়ার সঙ্গে। গণভবনেও ছিল তার অবাধ যাতায়াত।

কেঁওচিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতা আবু তালেব সিকদার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে সম্প্রতি জামিনে বের হন।

এখন তাদের মুখে ভিন্ন সুর

আওয়ামী লীগ থেকে এলডিপিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মনির আহমদ বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের একজন সমর্থক ছিলাম। দলে আমার কোন পদপদবি ছিল না। বর্তমানে আমি এলডিপির সমর্থক হিসেবে ফরম পূরণ করেছি।’

আরেক দলত্যাগী আবু তালেব মেম্বার বলেন, ‘আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে কিছুই পাইনি। মানুষের সাথে কোনো অন্যায় আচরণ ও অত্যাচার করিনি। তারপরও জেল জুলুমের শিকার হয়েছি। তাই সদস্য ফরম পূরণ করে এলডিপিতে যোগদান করেছি।’

ইউপি সদস্য সাহেব মিয়া বলেন, ‘আমাদের (কেঁউচিয়া) পরিষদের চেয়ারম্যান ওচমান আলী আওয়ামী লীগের ছিলেন। তাই ইউপি সদস্য হিসেবে বাধ্য হয়ে আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিলাম। কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ। তাই ওনার দলে যোগদান করেছি। আগামী নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে তার পক্ষে কাজ করব ইনশাল্লাহ।’

উত্তর সাতকানিয়া আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক রোকেয়া বেগম দলবদলের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

মনির চেয়ারম্যানসহ কেঁওচিয়ার চার আওয়ামী লীগ নেতার এলডিপিতে যোগদানের বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা এলডিপির সভাপতি এয়াকুব আলী বলেন, যোগদানকারীরা প্রাথমিক সদস্য পদ পূরণ করে আমাদের দলে যোগ দিয়েছেন। যে কেউ এক দল থেকে অন্য দলে যাওয়ার অধিকার রাখে। কারও বিরুদ্ধে যদি কোন দুর্নাম ও মামলা না থাকে তারা আমাদের দলে যোগ দিতে পারবেন।’

আবু তালেবের বিরুদ্ধে তো মামলা আছে— এমন প্রশ্নের জবাবে এলডিপি নেতা বলেন, ‘বিষয়টি কেঁওচিয়া ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ ভালো বলতে পারবেন। কারণ যোগদানকারীদের আমাদের কাছে নিয়ে এসেছেন কেঁওচিয়া ইউনিয়ন এলডিপি। তবুও এ রকম অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

ক্ষোভে ফুঁসছে তৃণমূল

এদিকে আওয়ামী লীগ নেতাদের দলত্যাগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকেই। নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা শাখার সাবেক সহসভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বিপ্লব বড়ুয়া দাদা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী নিয়োগ পাওয়ার পর মাসের ৩০ দিনের মধ্যে ২০-২৫ দিন এসব সুবিধাভোগীরা গণভবনে পড়ে থাকতো। অথচ আমরা মাঠে ময়দানে দলের জন্য এত এত কাজ করার পরও গণভবন তো দূরের কথা, ঠিকমতো আমাদের সেসব নেতারা চিনতো না। কারণ তাদের চাটুকারিতা করতাম না। অথচ আজ দলের দুঃসময়ে তারা একবারও চিন্তা করলো না বিগত সময়ে যেসব নেতাদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছে, অন্য দলে যোগদানকে কেন্দ্র করে সেসব নেতারা প্রশ্নবিদ্ধ হবেন কিনা।’

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm