১০ বছর পর শুরু হচ্ছে সাতকানিয়ার আবুল হাশেম হত্যাকাণ্ডের বিচার
জামায়াত নেতাসহ ১৪ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন
প্রায় এক দশক ধরে ধামাচাপা পড়ে থাকা চাঞ্চল্যকর আবুল হাশেম হত্যা মামলায় অবশেষে বিচার শুরু হতে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার মসজিদ-মাদ্রাসার জমি দখলকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১০ বছর পর আদালত ১৪ জন আসামির বিরুদ্ধে হত্যা ও হামলার অভিযোগে চার্জগঠনের আদেশ দিয়েছেন।
গত ২০ এপ্রিল চট্টগ্রামের ৬ষ্ঠ অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক বিলকিস আক্তার চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার মাহালিয়া গ্রামে মসজিদ-মাদ্রাসার ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘটিত আবুল হাশেম হত্যাকাণ্ডের এই মামলায় ১৪ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন। আসামিদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০২ (হত্যা), ৩২৬ (অঙ্গহানি), ৩০৭ (হত্যার প্রচেষ্টা), ৩৮৯ (হুমকি দিয়ে জিনিস আদায়), এবং ৩২৩ (স্বল্পপর্যায়ের আঘাত) ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রায় এক দশক ধরে বিলম্বিত থাকা এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার চার্জগঠন আদালতের আইনি প্রক্রিয়ায় এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে বাদীপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী আসামিদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, নিরাপত্তা সংকট এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য বিঘ্ন এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
আসামি যারা
মামলার আসামিদের মধ্যে মাশুকুর রহমান জামায়াতে ইসলামীর ইউনিয়ন আমীর। অন্যরা হলেন— ফয়েজুর রহমানের পুত্র আমিনুর রহমান ওরফে খুল্লাইয়া ও মোস্তাফিজুর রহমান, আমিনুর রহমানের পুত্র তৌহিদুর রহমান ও আতিকুর রহমান, মো. সোলাইমান, মোস্তাফিজুর রহমানের পুত্র মোঃ জাকারিয়া, আহমদুর রহমানের পুত্র বজলুর রশীদ, জাফর আহমদ, মাহফুজুর রহমান, মুজিবুর রহমান, বাজালিয়া মাহালিয়ার ইসলাম মিয়ার পুত্র মো. সেলিম, কেওচিয়া মাদারবাড়ির হামিদ হোসেনের পুত্র রাশেদ হোসেন, ঢেমশার মোঃ আনোয়ার কামাল ওরফে মানিক।
জমি দখল নিয়ে বিরোধে বর্বর হামলা এবং মৃত্যু
২০১৫ সালের ৮ জানুয়ারি মাহালিয়া গ্রামের জামে মসজিদ ও মাদ্রাসার ওয়াক্ফকৃত জমির দখল নিয়ে মসজিদ কমিটির সঙ্গে আসামিপক্ষের তীব্র বিরোধ তৈরি হয়। মসজিদ কমিটির দাতা সদস্য আবুল হাশেম গ্রাম আদালতে অভিযোগ দায়ের করলে আসামিরা ক্ষিপ্ত হন। তারা আদালতের রায় অমান্য করে এবং পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বিতর্কিত জমি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা চালায়।
ঘটনার দিন স্থানীয়রা বাঁধা দিলে আসামী আমিনুর রহমান ও মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে ১৬-১৭ জনের একটি দল মসজিদ কমিটির সভাপতি আবু মুছা ও দাতা সদস্য আবুল হাশেমকে লক্ষ্য করে বর্বর হামলা চালায়। হামলায় রাম-দা, লোহার রড ও কাঠের বাটাম ব্যবহৃত হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের প্রথমে সাতকানিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে ৫ দিন পর আবুল হাশেম মৃত্যুবরণ করেন।
বারবার বাধা, আসামি এখন ১৪
আবুল হাশেমের মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমে সাতকানিয়া থানা পুলিশ ১৭ আসামির মধ্যে ৭ জনের নাম বাদ দিয়ে ১০ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়। বাদীর নারাজির পর আদালতের আদেশে পিবিআই তদন্ত করে ৪ জনকে ‘নট সেন্ট আপ’ করে ১৩ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট জমা দেয়। পরে বাদীপক্ষের দ্বিতীয়বার নারাজি আবেদনের ভিত্তিতে তিনজন ‘নট সেন্ট আপ’ আসামির বিরুদ্ধেও অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়। তবে তদন্ত চলাকালীন দুই আসামির মৃত্যু হওয়ায় বর্তমানে চার্জগঠনের আওতায় আসা আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪।
আদালত প্রাঙ্গণে হুমকির অভিযোগ
চার্জগঠনের শুনানির দিনে আদালত ভবনে বাদীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তিনজন আসামির বিরুদ্ধে। এরা হলেন রাশেদ হোসেন, তৌহিদুর রহমান ও মো. সেলিম। এ বিষয়ে কোতোয়ালী থানায় দায়েরকৃত সাধারণ ডায়েরির সত্যতা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত তাদের জামিন বাতিলের আবেদন শুনানির জন্য পেন্ডিং রাখার আদেশ দেন।
জামায়াত নেতা আসামি
চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে অন্যতম মাশুকুর রহমান বর্তমানে জামায়াত ইসলামীর একজন ইউনিয়ন আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার সংশ্লিষ্টতা মামলাটিকে আরও আলোচিত করে তুলেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আসামিদের হুমকি, বাদি নিরাপত্তাহীনতায়
নিহত হাশেমের বড় ভাই ও মামলার বাদীপক্ষের প্রধান প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার আবুল কাশেম চার্জগঠন নিয়ে বলেন, ‘২০১৫ সালে সংঘটিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে একাধিকবার তদন্ত, বিচারিক আদালত পরিবর্তন এবং আসামিদের নানা চাপের মুখে বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর পর চার্জ গঠনের আদেশে আমরা সন্তুষ্ট হলেও আদালত ভবনে হুমকিদানকারী আসামিদের জামিন বহাল থাকায় আমরা চরম উদ্বেগে রয়েছি। এতে মামলার সাক্ষ্য ও বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’
সিপি