চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যুতে টেন্ডার সিন্ডিকেটের খেলা, নিয়ম ভেঙে কাজ পাচ্ছে ‘পছন্দের’ লোক
দরপত্রে কারসাজি করে কোটি কোটি টাকার লুটপাট
সরকারি ক্রয় আইনকে পাশ কাটিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দিচ্ছে, যা কেবল দুর্নীতির অভিযোগই নয়, বরং সরকারি তহবিলের অপব্যবহারকেও সামনে নিয়ে এসেছে। সর্বনিম্ন দরদাতাকে এড়িয়ে উচ্চ মূল্যে চুক্তি করা হচ্ছে, যাতে বন্দরের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশের প্রমাণ মিলছে। লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল-২ প্রকল্পে দরপত্র কারসাজির মাধ্যমে প্রায় কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে চুক্তি হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গড়ে ওঠা বড় একটি সিন্ডিকেট এখনও আরও বেপরোয়া। এর ফলে বন্দরের দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের শক্তিশালী জালে আরও বেশি সরকারি অর্থ অপচয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বন্দরের বিদ্যুৎ বিভাগ লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল-২-এর একটি প্রকল্পে কিভাবে দরপত্রে জালিয়াতি ও শর্ত পরিবর্তন করে পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দিয়েছে— তার বিস্তারিত অনুসন্ধান করেছে চট্টগ্রাম প্রতিদিন।
দরপত্র কারসাজির সাম্প্রতিক উদাহরণ
গত ফেব্রুয়ারিতে লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল-২-এ ‘হাই মাস্ট ও এলইডি লাইট স্থাপন’ কাজের জন্য টেন্ডার ডাকা হয়। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ দুজন সর্বনিম্ন দরদাতাকে উপেক্ষা করে তৃতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এএন্ডজে ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়। ওই প্রতিষ্ঠানটির দরপ্রস্তাব ছিল ৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, যা প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতার তুলনায় ১ কোটি ১২ লাখ টাকা বেশি এবং দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার তুলনায় ৪১ লাখ টাকা বেশি। ওই প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেওয়ার পুরো বিষয়টিই হয়েছে অস্বাভাবিক গোপনীয়তায়।
বন্দর কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে নিশ্চিত করেন, বন্দর কর্তৃপক্ষের ইলেকট্রিক্যাল বিভাগের শীর্ষ দুই কর্মকর্তার সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এএন্ডজে ইন্টারন্যাশনালের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এতে যোগসাজশের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা গত ৪-৫ বছর ধরে বিভিন্ন নামে একাধিক প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে দরপত্র জিতে আসছে। এএন্ডজে ইন্টারন্যাশনাল নামের এই প্রতিষ্ঠানটির মালিক জাহাঙ্গীর আলম। তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চট্টগ্রাম বন্দরভিত্তিক বিভিন্ন কাজে ব্যাপক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
দরপত্র মূল্যায়নে দুমুখো নীতি: যোগ্য-অযোগ্যের রহস্যময় মাপকাঠি
লালদিয়া প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নে দেখা গেছে, পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার জন্য একের পর স্ববিরোধিতা করে যাওয়া হয়েছে। দেখা গেছে, প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতাকে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করা হয় ‘৭ কোটি ৭০ লাখ টাকার সমপরিমাণ অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ না করা’র অভিযোগে। অথচ তারা দরপত্রে অংশ নিতে অনুমতি পেয়েছিল। আবার দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে ‘নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার অভাব’ দেখিয়ে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করা হয়, অথচ তারা সব শর্তই পূরণ করেছিল। আবার গুরুতর অসঙ্গতি থাকার পরও চতুর্থ সর্বনিম্ন দরদাতাকে ‘যোগ্য’ ঘোষণা করা হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষ এই দরদাতা প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতার যে নথি গ্রহণ করেছে, সেটি ছিল দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি যৌথ উদ্যোগের (জেভি) অংশ, যা বন্দর কর্তৃপক্ষই দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার ক্ষেত্রে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করেছিল। প্রশ্ন উঠেছে, একই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এক প্রতিষ্ঠানকে যদি বাদ দেওয়া হয়, সেই একই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আরেক প্রতিষ্ঠানকে কিভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে?
শর্ত বদলে সুবিধা পেল ‘পছন্দের’ ঠিকাদার
কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দরপত্রের নির্দিষ্ট শর্তগুলো সুবিধামতো পরিবর্তন করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। যেমন ৭.৮ কেজি কপার-ওয়েটেড লাইট সরবরাহের শর্ত দেওয়া হলেও নির্বাচিত ঠিকাদার ৭.২ কেজি ওজনের লাইট সরবরাহ করবে। দরপত্র অনুযায়ী পণ্য যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা জাপানের হতে হবে। কিন্তু নির্বাচিত ঠিকাদার সরবরাহ করবে চীনের উৎপাদিত লাইট। এছাড়া লাইটের মূল উপাদান এলইডি ড্রাইভের ক্ষেত্রে ‘ইনভেনট্রনিকস’ ব্র্যান্ডের এলইডি ড্রাইভ সরবরাহের শর্ত থাকলেও নির্বাচিত ঠিকাদার থেকে নেওয়া হচ্ছে চীনের তৈরি নিম্নমানের ড্রাইভ।
এ বিষয়ে বন্দরের সদস্য (প্রকৌশল) কমোডর কাওসার রশীদ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘সর্বনিম্ন দরদাতা দুটি প্রতিষ্ঠানই ২৮৬ ওয়াটের লাইট সরবরাহের কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু আমাদের রিকোয়ারমেন্ট ছিল ৩০০ ওয়াট, যা নির্বাচিত দরদাতা প্রতিষ্ঠান ফুলফিল করতে পেরেছে।’
শর্তে ৭.৮ কেজি থাকার পরও ৭.২ কেজি কিভাবে গ্রহণযোগ্য হল— এমন প্রশ্নের জবাবে কাওসার রশীদ বলেন, ‘ওয়াটের সঙ্গে হাইটের একটা ভারসাম্য থাকতে হয়। সেক্ষেত্রে যতো হালকা হবে, ততোই ভালো। তাছাড়া সর্বোচ্চ মান হিসেবে আমরা ৭.৮ কেজি উল্লেখ করা হয়েছে। এর কম হলেও ক্ষতি নেই। বরং ভালো।’
দরপত্রে নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করে দেওয়ার পরও চীনে উৎপাদিত ‘নিম্নমানের’ লাইট কেন গ্রহণ করা হচ্ছে, এ প্রসঙ্গে বন্দরের এই সদস্য (প্রকৌশল) বলেন, ‘চীনে উৎপাদিত হলেও সেগুলো সরবরাহ করছে যুক্তরাজ্যের কোম্পানি। সেক্ষেত্রে দরপত্রের শর্ত লঙ্ঘন হয়নি। আমরা বোর্ডে আলোচনা করেই সিদ্ধান্তটি নিয়েছি।’
সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান এএম ইঞ্জিনিয়ারিং অবশ্য দাবি করেছে, তারা ৩০০ ওয়াটের সরবরাহের কথাই দরপত্রে উল্লেখ করেছিল। কিন্তু সেটি উপেক্ষা করা হয়েছে মূল্যায়নে। তাছাড়া ইউরোপ বা আমেরিকার যে কোম্পানিই লাইট সরবরাহ করুক না কেন, সেই লাইট তো তৈরি হচ্ছে চীনেই। এক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান এএন্ডজে ইন্টারন্যাশনাল যুক্তরাজ্যের ‘অ্যাবাকাস লাইটিং’-এর নাম ব্যবহার করলেও তারা সরবরাহ করবে চীনের ‘চ্যাংঝো ইউ শেনইয়া লাইটের’ তৈরি পণ্য।
জাল নথি দিয়ে অংশগ্রহণ, তবু নিশ্চুপ বন্দর কর্তৃপক্ষ
২৭ ফেব্রুয়ারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এএম ইঞ্জিনিয়ারিং আনুষ্ঠানিকভাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বরাবরে একটি অভিযোগ জমা দেয়। তাতে প্রতিষ্ঠানটি দরপত্রের নথিপত্র যাচাইয়ের অনুরোধ করে। কারণ তারা সন্দেহ করছিল, একটি প্রতিষ্ঠান সেখানে জাল নথিপত্র ব্যবহার করে দরপত্র প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি করেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এএন্ডজে ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে যোগসাজশ করে ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল দরপত্রে গুরুতর প্রতারণার আশ্রয় নেয়। দরপত্রে তারা জার্মানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সিটিকো জিএমবিএইচের ভুয়া ‘অথরাইজেশন লেটার’ ব্যবহার করে। অথচ সিটিকো ওই প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের কিছুই দেয়নি বলে জার্মানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি ইমেইলে জানিয়েছে। এমনকি বিষয়টি জানামাত্র সিটিকো জিএমবিএইচের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (প্রকৌশল), পরিচালক (বিদ্যুৎ) এবং নির্বাহী প্রকৌশলী আনাস মাহমুদকেও (বিদ্যুৎ) ইমেইলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, ম্যাক্সওয়েল নামের কোনো প্রতিষ্ঠানকে তারা কোনো ‘অথরাইজেশন লেটার’ দেয়নি। পরে এএম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পক্ষ থেকে বিষয়টি সরাসরি বন্দরের সদস্য (প্রকৌশল) কাওসার রশীদকে জানানো হলে তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে জানান। তবে বাস্তবে তারা সকলেই বিষয়টি উপেক্ষা করে যান। এ অবস্থায় ২৭ ফেব্রুয়ারি দরপত্র কমিটির আহ্বায়কের কাছে লিখিত আবেদন করে জালজালিয়াতির বিষয়ে সঠিক তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, বন্দর কর্মকর্তাদের বিশেষ পছন্দের প্রতিষ্ঠান এএন্ডজে ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে ম্যাক্সওয়েলের সংশ্লিষ্টতা থাকায় তারা এই জালিয়াতির বিষয়টি গোপন করার চেষ্টাই করে গেছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অতীতেও এমনটিই হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকাদারদের অভিযোগ
এএম ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ব্যবস্থাপনা অংশীদার মো. শফি আলম চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা ২৬ বছর ধরে কাজ করছি। কিন্তু বন্দরের সিন্ডিকেট দরপত্র প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে। যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে অযোগ্য ঘোষণা করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিচ্ছে তারা।’
সাউথ এশিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসের মালিক এনামুল হক বলেন, ‘২০২০ সালের পর থেকে আমরা কোনো দরপত্র পাইনি, এমনকি সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়ার পরও। দরপত্র নিয়ন্ত্রণ করছে সিন্ডিকেট।’
মানান অ্যান্ড সন্সের প্রকৌশলী হাসান মো. জুয়েল বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে মাত্র ছয়টি প্রতিষ্ঠান—যা তিনজন ব্যক্তির নেতৃত্বে পরিচালিত—সবচেয়ে বেশি ঠিকাদারি কাজ পেয়েছে।’
পঞ্চম সর্বোচ্চ দরদাতা, তবু কাজ পেল সাবেক মন্ত্রীর ভাই
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জেটি এলাকার কেমিক্যাল শেডের জন্য পাঁচ হাজার কেজি ক্ষমতাসম্পন্ন টু-স্টেপের চীনা কার্গো লিফট কেনে। তাতে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা প্রস্তাব দেয়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ পঞ্চম সর্বোচ্চ দরদাতার ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকার প্রস্তাবটিই গ্রহণ করে। এতে প্রায় ৮৫ লাখ টাকা বেশি খরচ হয়েছে। বেশি দামে সেই কাজটি দেওয়া হয় সিপিডিএল লিমিটেডকে, যার মালিক হলেন আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ইফতেখার হোসেন সোহাগ।
এ বিষয়ে বন্দরের সদস্য (প্রকৌশল) কমোডর কাওসার রশীদ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে প্রথম দফায় টেন্ডার করে আমরা উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাইনি। তাছাড়া সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান যে মূল্যে লিফট সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল, সেই মূল্যে ভালো লিফট সরবরাহ করা অসম্ভব। আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি, লোয়েস্ট দরদাতা প্রতিষ্ঠানের সার্ভিসও খুবই খারাপ। পরে আমরা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়ে জার্মানির হামবুর্গের একটি কোম্পানির লিফট সরবরাহের কার্যাদেশ দিই।’
টেন্ডার সিন্ডিকেট: কর্মকর্তাদের ছত্রছায়ায় লুটপাট
ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দরপত্র সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের দুই কর্মকর্তা— পরিচালক (বিদ্যুৎ) এসএম সাইফুল ইসলাম এবং উপ-প্রধান প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী। তারা নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিচ্ছেন। এই ঠিকাদারদের মধ্যে আছে এএন্ডজে ইন্টারন্যাশনাল ও ম্যাক্সওয়েল। ম্যাক্সওয়েল ভিন্ন ব্যক্তির নামে হলেও সেটির নিয়ন্ত্রণ মূলত এএন্ডজে ইন্টারন্যাশনালের মালিক জাহাঙ্গীর আলমের হাতে। তবে এএন্ডজে ইন্টারন্যাশনালের মালিক জাহাঙ্গীর আলম চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘ম্যাক্সওয়েলের অন্যজনের প্রতিষ্ঠান। আমি কিভাবে সেটা নিয়ন্ত্রণ করবো?’
অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সূত্রে খবর নিয়ে জানা গেছে, বন্দরের বিদ্যুৎ বিভাগের দরপত্র সিন্ডিকেটে আছেন হক টেকনোর আবু সুফিয়ান, পাওয়ার কন্ট্রোলের জাহিদ, আইপি ইন্টারন্যাশনালের পারভেজ, সিম্যান্স পাওয়ার প্লাসের সাখাওয়াত, শুভেচ্ছা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জসিমসহ আরও বেশ কয়েকজন। এরাই ঘুরেফিরে সব কাজ পান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যুৎ বিভাগে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরের সব টেন্ডারে দৃশ্যত কোনো প্রতিযোগিতাই ছিল না। হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান শত শত কোটি টাকার কাজ পেয়েছে একচ্ছত্রভাবে। ‘জরুরি’ দেখিয়ে টেন্ডার ছাড়াই কাজ দেওয়ার ঘটনাও অহরহ আছে। পরে সেই টেন্ডারগুলো ‘নিয়মিত’ করে নেওয়া হয় কৌশলে।
জোরপূর্বক গুম এবং হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হওয়া চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েলের সঙ্গে যোগসাজশে চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যুৎ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা কোটি কোটি হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, ওপরমহলকে ‘খুশি’ রেখে যা বর্তমানেও অব্যাহত আছে। সোহায়েল শুধু চট্টগ্রাম বন্দর থেকেই কয়েক হাজার কোটি টাকা লুট করেছেন বলে বিভিন্ন তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যূত হওয়ার পর সাধারণ ব্যবসায়ী ও ঠিকাদাররা আশা করেছিলেন, বন্দরের বিদ্যুৎ বিভাগে লুটপাটের সংস্কৃতি বন্ধ হবে। দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল সম্পদ গড়ে তোলা কর্মকর্তাদের শাস্তি হবে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টোটা। বিদ্যুৎ বিভাগের শীর্ষ পদে থাকা কর্মকর্তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। আগে যারা আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাব খাটিয়ে কাজ বাগিয়ে নিতেন, তারাও এখনও কলকাঠি নেড়ে যাচ্ছেন আগের মতোই।
বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে পরিচালক (বিদ্যুৎ) এসএম সাইফুল ইসলাম এবং উপ-প্রধান প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরীর মোবাইলে একাধিকবার ফোন করেও তাদের সাড়া মেলেনি।
অভিযোগ প্রসঙ্গে এএন্ডজে ইন্টারন্যাশনালের মালিক জাহাঙ্গীর আলম চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে সবকিছু হয়। ফলে কারও মাধ্যমে আঁতাত করে টেন্ডারে প্রভাব খাটানোর সুযোগ নেই। আমার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ বানোয়াট। সবকিছু বন্দর কর্তৃপক্ষই যাচাই-বাছাই করে দেখেছে।’
এক মালিকের একাধিক কোম্পানি
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল) কমোডর কাওসার রশীদ স্বীকার করেছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এএন্ডজে ইন্টারন্যাশনাল ও ম্যাক্সওয়েল একই লোকের মাধ্যমে পরিচালিত। তবে চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে তিনি বলেন, ‘ধরুন আমি জানি আপনার একাধিক কোম্পানি আছে, ধরুন ১০টি কোম্পানিই আছে, কিন্তু সেক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ আমরা দিতে পারি না। টেন্ডারে এভাবে পার্টিসিপেট করা যায়।’
গত বছরও ছিল ১৩১৪ কোটির অনিয়ম
কম্পট্রোলার ও অডিটর জেনারেল (সিএজি) প্রতি বছর চট্টগ্রাম বন্দরের আর্থিক অনিয়ম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ১ হাজার ৩১৪ কোটি টাকার ৭২টি বড় আর্থিক অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ২৬৫ কোটি টাকার ৪৪টি ঘটনা ছিল দরপত্র কারসাজি ও চুক্তি ব্যবস্থাপনার দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
সিন্ডিকেটের রোষে অভিযোগকারীকেই ব্ল্যাকলিস্ট
১২ মার্চ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে এএম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পক্ষ থেকে একটি অভিযোগ দেওয়ার পর ১৮ মার্চ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। আগামী ৭ এপ্রিল শুনানির জন্য সব পক্ষকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে ডাকা হয়েছে।
তবে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে হঠাৎ করে ২৪ মার্চ (১৮ মার্চের পেছনের তারিখ দেখিয়ে করা আদেশে) অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠান এএম ইঞ্জিনিয়ারিংকেই ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ করে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পরিচালক (বিদ্যুৎ) এসএম সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানটি ‘ভুল তথ্য দিয়ে দরপত্র প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে।’ অথচ কোথায় ও কিভাবে ‘ভুল তথ্য’ দেওয়া হয়েছে— সেটাই উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুযায়ী এমন পরিস্থিতিতে শোকজ নোটিশ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও এএম ইঞ্জিনিয়ারিংকে সেটাও দেওয়া হয়নি।
এএম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করার কারণে চট্টগ্রাম বন্দর বিদ্যুৎ বিভাগে সিন্ডিকেটের কর্মকর্তারা ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের প্রতিষ্ঠানটিকে কালোতালিকাভুক্ত করেছে।
টেন্ডার সিন্ডিকেটের দাপট, কর্তৃপক্ষের নীরবতা
চট্টগ্রাম বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিশাল দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের উপস্থিতি স্পষ্ট। সিন্ডিকেট সদস্যরা নিয়মিত দরপত্রের শর্ত পরিবর্তন, যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে অযোগ্য ঘোষণা এবং নিজেদের সুবিধাজনক প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় করছে। এ বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দ্রুত তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন থাকলেও তারা এ বিষয়ে বিস্ময়কর নীরবতা পালন করে যাচ্ছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের এই অনিয়ম বন্ধ করতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে স্বচ্ছ তদন্ত পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।
সিপি