নবীজি (সা.)–এর প্রিয় সাহাবিদের মধ্যে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) ছিলেন হাদিস বর্ণনায় সর্বাধিক কৃতিত্বের অধিকারী। তিনি স্বল্প সময়ে রাসুল (সা.)–এর সান্নিধ্যে থেকে ইলমে গভীর মনোনিবেশ করেছিলেন এবং কঠোর সাধনার মাধ্যমে হয়ে উঠেছিলেন হাদিস শাস্ত্রের শীর্ষ আলোকবর্তিকা। সাহাবিদের মধ্যে সর্বাধিক হাদিস তিনি-ই বর্ণনা করেছেন। তাঁর বর্ণনাকৃত হাদিসের সংখ্যা ৫ হাজার ৩৭৪টি। কেবল সহিহ বোখারিতে রয়েছে ৪৪৮টি এবং সহিহ মুসলিমে ৫৪৫টি।
অষ্টম হিজরির শেষ দিকে ইয়েমেন থেকে মদিনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন আবু হুরায়রা (রা.)। মায়ের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা ও টান ছিল। তবে তাঁর মা তখনও ইসলাম কবুল করেননি। এ নিয়ে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত ছিলেন। একদিন তিনি নবীজি (সা.)–এর কাছে কাঁদতে কাঁদতে অনুরোধ করলেন মায়ের জন্য দোয়া করতে। রাসুল (সা.) তখন দোয়া করেন: ‘হে আল্লাহ! আবু হুরায়রার মাকে হেদায়েত দান করো।’ নবীজির সেই দোয়ার পরপরই তাঁর মা ইসলাম গ্রহণ করেন।
ইসলাম গ্রহণের আগে তাঁর নাম ছিল আবদে শামস। পরে নবীজি (সা.) তাঁর নাম রাখেন আবদুর রহমান। তবে তিনি ‘আবু হুরায়রা’ উপনামেই প্রসিদ্ধ হন। কারণ একবার তিনি জামার হাতায় একটি বিড়ালের বাচ্চা রেখেছিলেন। এ দৃশ্য দেখে রাসুল (সা.) তাঁকে ডেকে বললেন ‘আবু হুরায়রা’ (বিড়ালওয়ালা)। এরপর থেকেই এই নাম বিশ্বমুসলিমের কাছে তাঁর পরিচিতি হয়ে ওঠে।
আবু হুরায়রা (রা.) ছিলেন একেবারেই অভাবী মানুষ। জীবিকার জন্য বাজার বা কৃষিকাজে যুক্ত হতে হয়নি তাঁকে। বরং দিনরাত তিনি নবীজি (সা.)–এর দরবারে উপস্থিত থাকতেন, যা অন্য সাহাবিদের পক্ষে সম্ভব হতো না। ফলে তিনি অধিকাংশ সময় নবীজির সান্নিধ্যে থেকে শিখতে পেরেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন, অন্য সাহাবিরা ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকলেও তিনি ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করে ইলম অন্বেষণ করতেন।
একবার নবীজি (সা.) সাহাবিদের বললেন, ‘যে আমার কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত তার চাদর বিছিয়ে রাখবে এবং শেষে তা বুকের সঙ্গে মিলিয়ে নেবে, সে কখনো আমার কথা ভুলবে না।’ আবু হুরায়রা (রা.) তা-ই করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে বলেন, ‘সেই সত্তার কসম, যিনি নবীজি (সা.)–কে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, আমি তখন থেকে তাঁর কোনো কথা ভোলেনি।’
আবু হুরায়রা (রা.)–এর জ্ঞানপিপাসা এতটাই প্রবল ছিল যে তিনি একদিন নবীজি (সা.) হঠাৎ অনুপস্থিত হলে শঙ্কিত হয়ে খোঁজে বের হয়ে পড়েন। বনু নাজ্জারের এক বাগানে তিনি সংকীর্ণ নালা দিয়ে প্রবেশ করে নবীজির কাছে পৌঁছে যান। তখন নবীজি (সা.) তাঁকে জুতার জোড়া দিয়ে বলেন, বাইরে যাকেই পাও তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও, যদি সে দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলে যে ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই’।
এমন একনিষ্ঠ সাধনা, অক্লান্ত উপস্থিতি ও অতুলনীয় স্মৃতিশক্তির কারণে আল্লাহ তাঁকে হাদিস বর্ণনায় অসামান্য মর্যাদা দান করেছেন। সাহাবিদের মধ্যে সর্বাধিক হাদিস সংরক্ষণের পেছনে তাঁর অবদান অনন্য।
ইসলামের ইতিহাসে হাদিস বর্ণনাকারী শীর্ষ সাহাবিদের মধ্যে রয়েছেন হজরত আবু হুরায়রা (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.), আনাস ইবনে মালিক (রা.), আয়েশা (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) এবং আবু সায়িদ খুদরি (রা.)। তাঁদের প্রচেষ্টার ফলেই নবীজি (সা.)–এর বাণী সংরক্ষিত হয়ে আমাদের কাছে পৌঁছেছে।
মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে হজরত আবু হুরায়রা (রা.)–এর মতো ইলম অন্বেষণ ও সংরক্ষণে অনুপ্রাণিত করেন, এবং হেদায়েতের সরল পথে পরিচালিত করেন। আমিন।
লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট